Monday , 19 November 2018
এই মূহুর্তেঃ-

বন্ধুর অসমাপ্ত কিছু মনের কথা………………

Saif

 

এস এস সি পাস করে সবে মাত্র কলেজে পা রাখলাম। ঐতিহ্য বাহী বৃন্দাবন সরকারী কলেজে। কলেজের সুন্দর সুন্দর  জায়গায় বসা, শহীদ মিনার, পুকুর পাড়ে বন্ধুদের নিয়ে  ইচ্ছে, মনের কথা নিয়ে আলোচনা। ১ম দিন ১ম ক্লাস। অনেক অজানা ক্লাসমিট। চুল লম্বা ডিলেঢালা শার্ট, সবার থেকে একটু বেশি চঞ্চলতা, দুষ্টোমি, মেয়েদের চুলে চুইংগাম লাগানো, টিস করা, ইত্যাদি ইত্যাদি।  চলতে চলতে একদিন হঠাৎ চোখে নতুন চেহারা বক পাখির সাদা রং এর পরিহিতা একজন আমাদেরই ক্লাসে। But খুব মোডি, অহংকারী, মেধাবী, চশমা পরিহিতা। প্রায়ই দেখি নাম তো জানিনা। কারো সাথে খুব বেশি একটা কথা ও বলে না। বান্ধবীরাও তেমনই। যাই হোক অনেক বন্ধুদের সহযোগিতায় নাম জানা হলো। “শাড়াঁ” দেখতে খুবই সুন্দরী, চুল অনেক লম্বা। সমস্যা হলো সে সব সময় একা একা বান্ধবী ছিল হাতে গোনা ২/৩ জন। যাই হোক আমার খুব পছন্দ তাকে কি করা যায়। সব ছেলে মেয়ের সাথে কথা বলা হয় কিন্তু তার সামনে গেলেই আমি কেন যেন বোকা হয়ে যাই। সাহস করে তাকে কিছু বলতেও পারি না। বুঝাতে ও পারিনা। দীর্ঘদিন এমন করেই চলতে থাকল। এক দিন তার বান্ধবীকে খুব করে ম্যানেজ করে বললাম তোমার বান্ধবী শাড়াঁকে আমার সাথে কথা বলিয়ে দিবে। পর দিন সে আর কলেজেই আসেনি। আমার তো মাথা খারাপ। কলেজে ক্লাসে মন তো বসে না। ওর সেই বান্ধবীও আসেনি। মোবাইল তো ছিল না তখন। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বাসায় চলে আসলাম। পরদিন আবার অপেক্ষা। অপেক্ষার পালা শেষ করে শেষ পর্যন্ত আসা হল আমার প্রিয়মুখ প্রিয় মানুষ “শাঁড়া”র। গেইটের পাশে দাড়িয়ে রইলাম ছোট একটা মুচকি হাসি দিয়েই কমন রুমে চলে গেল। ওর বান্ধবীর জন্য অপেক্ষায় রইলাম। কি কি কথা হলো। বান্ধবীর দুই দিন আসা হল না। আমার সময় তো যায় না। যাই হোক শেষ পর্যন্ত বান্ধবীকে পেলাম সে বলল আমি বলেছি কিন্তু সে কোন উত্তর দেয়নি। ১মবর্ষ পার হয়ে গেল। পরীক্ষা চলে আসলো পড়া লেখায় মনতো বসে না। তাকে ভেবেই সময় পার হতে লাগলো। হঠাৎ এক দিন খবর পেলাম তার বাবা সরকারি চাকরি করেন। বদলি হয়ে রাজশাহি চলে গেছেন। শাঁড়া কেও চলে যেতে হবে। সেদিন কলেজে এসেই আমার জন্য মনে হচ্ছিল যেন সে অপেক্ষা করছে। আমি কলেজের গেইটে আসার সাথে সাথেই বান্ধবী কে দিয়ে খবর পাঠালো পুকুর পাড়ে দেখা করবে শাঁড়া। আমার অবাক লাগছে ভয় পাচ্ছিলাম, আবার বিশ্বাস ও করতে পারছিলাম না যে সত্যি কি আমার সাথে দেখা করবে ? গেলাম দেখা করতে সে শুধু একটা কথা বলেছে আমায় বাবা বদলি হয়ে গেছেন আমাকে চলে যেতে হবে। আমাকে ভুলে যেয়ো। সে দিনই যানতে পারলাম আমাকেও সে পছন্দ করতো। চলে গেল। আমি বোকার মত পুকুর পারে বসে রইলাম । দেখতে দেখতে চলে আসলো ফাইনাল পরীক্ষা।

পড়ালেখা আর হলো না। অনেক কষ্ট করে এইচএসসি পাস হলো। তারপর থেকেই বেকার সিগারেট ধরা হল। নিরবে নিঃশব্দে যেন কি হয়ে গেল। শাঁড়া ভাল রেজাল্ট করে ভার্সিটিতে ভর্তি হল। দিন মাস বছর কেটে গেল, সে একটা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানীতে  তে জব করে। জানিনা আমার কথা তার মনে আছে কিনা। বান্ধবীর নাম বলা হয়নি, তার নাম ছিল তানিয়া। তানিয়ার সাথে মাঝে মাঝে দেখা হয়। তানিয়া আমাকে অনেক বুঝিয়েছে, স্বাভাবিক জীবনে চলে আসতে বলেছে, কিন্তু কি আর করা, সম্ভব হলো না। এক দিন তানিয়া কে শাঁড়া বলছিল প্রিতম কোথায় রে ? কি করে এখন ? তানিয়া বলল তুই ই তো ওর জীবনটা কে নষ্ট করে দিলি। তুই চলে যাওয়ার পর থেকে সে সব কিছু ছেরে দিয়েছে পড়া লেখা কলেজ বন্ধু বান্ধবী সব কিছু তার শেষ হয়ে গেছে। এখন শুধু রাস্তায় রাস্তায় পাগলের মত ঘুরে বেড়ায়। লম্বা দাড়ি লম্বা চুল দেখলে চিনতে পারবি না। তার অবস্থা খারাপ রে……….দীর্ঘশ্বাস। শাঁড়া বলছিল দেখ আমার ,আমার কোন দোষ নেই। আমি ও তাকে পছন্দ করতাম। কিন্তু বাবার বদলি হওয়ার কারনে আমাকে  অনেক কিছু সহ্য করতে হয়েছে। পরিবর্তন হতে হয়েছে। তাছাড়া তখন আমাদের বয়সটাই বা কতো ছিল বল ?? তখন পাগলামি করার বয়স ছিল ?? প্রিতম এ রকম সিরিয়াস হবে তা তো বুঝতে পা রি নি রে. . . . . .। চলনা এখন ও কোথায় ওর সাথে একটু দেখা করি। আমার নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে।

ঠিক আছে যাব আজ রাত হয়ে গেছে কাল ওকে। প্রিতম শেষ বারের মত খোলা আকাশে চিঠি লিখে সকাল বেলা যথারীতি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। হঠাৎ সকাল বেলা স্কুলে যাওয়ার পথে ৫ বছরের একটা মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে সে তার নিজের জীবনটাকে মাইক্রোবাসের নিচে বিলিয়ে দিল। বাড়ির সামনে অনেক মানুষ ভীর জমানো, তানিয়া বলছে কি ব্যাপার শাঁড়া এত মানুষ কেন এখানে ? এক জন কে ডেকে বলল ভাই কি হয়েছে এখানে ? ঐ বাড়ির প্রিতম পাগলটা একটা বাচ্ছাকে বাঁচাতে গিয়ে সে নিজেই মারা গেছে। শাঁড়া যেন থ…. হয়ে গেল শুনে। আরে কি বলেন এসব ! আপনি ভুল বলছেন। তার কান্না আর থামাতে পারলো না। হাও মাও করে কেদে ভিতরে গেল। তানিয়া শাড়াঁকে তখন যেন সামলাতেই পারছেনা । আনেক কষ্টে তাকে ঘরের বাহিরে নিয়ে আসলো। পাওয়া গেল তার বুক পকেটে রাখা শাঁড়া জন্য রেখে যাওয়া তার প্রিয়তমার উদ্দেশ্যে লেখা মনের কথা গুলো………….।

 

আমার প্রিয় শাঁড়া,

আমার অন্তরের অন্তস্থল থেকে আমার আদর ও ভালবাসা গ্রহন করিও। আর তোমার পছন্দের বেগুনী গোলাপের শুভেচ্ছা। যানি তুমি আমাকে পছন্দ করনা। আমাকে ছেরে চলে গেছ অনেক দূরে, অনেক দিন হল। তোমাকে দেখিনা কত দিন হয়। তারপর ও মনে হয় যেন প্রতিদিন তোমার সাথে আমার কথা হয়, দেখা হয়। তোমার সেই হাঁসিটা যেন, যেন আমার সা রা টা বুক জরিয়ে আছে। আমি মধ্যবিত্ব পরিবারের ছেলে তোমার বাবার মত এত টাকা পয়সা নাই। তারপর ও মনে আমার অনেক স্বপ্ন ছিল তোমাকে নিয়ে। প্রতিদিন ঘুমাতে যাই তোমাকে আদর করে আর ঘুম ভাংগে তোমার সেই হাঁসিটা দেখে। যান.., মাঝে মাঝে তোমার কপালের চুল গুলো যখন চোখের উপর পরে তখন আমি তোমার চুল গুলো উপরের দিকে তুলে দেই। তোমার কাছে অনেক কিছু লিখব বলে কলম নিয়েছিলাম হাতে। কিন্তু লিখতে বসলেই তুমি আমার সামনে চলে আস। তোমার দিকে তাকিয়েই আমার সময় চলে যায়। আর লিখা হয় না। যানি না তোমার হাতে এই এ চিঠি পৌছাবে কি না তবে এ কথা যানি তুমি আসবে অবশ্যই একদিন আসবে। হয়ত সে দিন আমি থাকব না, থাকবে না তোমাকে নিয়ে নীল আকাঁশের নিচে নীল শাড়ি পরে ঘুরে বেরানোর স্বপ্ন, থাকবে না তোমাকে নিয়ে নদীর পারে মুক্ত বাতাসে তোমার খোলা চুলে হাতে হাত ধরে অনন্দময় সময় কাটানোর স্বপ্ন। যানি না, কেন মনে হয় তুমি আমাকে মিস্ কর। আমার ধারনা মিথ্যে ও হতে পারে। যাক শাঁড়া মাঝে মাঝে মনে হয় হারিয়ে যায় অনেক, অনেক দুরে, যেখানে থাকবে না কোলাহল, ঝামেলা, হিংসা, অহংকার, প্রতারনা, ঘৃনা। থাকবে শুধু ভালবাসা, বিশ্বাস, হাসি ও আনন্দ। থাকব তুমি আর আমি ভালবাসা, ভাললাগা, খোলা আকাশ, সবুজ পাহাড়, সবুজ মাঠ, মুক্ত বাতাস। তোমার সময় নষ্ট করছি তাই না। সমস্যা নেই আমার এই চিঠি পড়ার সময় হয়ত নেই, তোমার হাতে পৌছাবে কিনা যানি না। সে দিন তানিয়া কে পেয়েছিলাম ইচ্ছে হচ্ছিল তোমার কথা জিজ্ঞেস করি পরে আর কিছু বলিনি। সিগারেট মনে হয় বেশী  টানি তাই বুকে খুব কাশ জমেছে। কারো সাথে ভাল করে কথা ও বলতে পারি না। শাঁড়া তোমাকে একটা কথা বলব সত্যি করে বলবে ? কাউকে ভালবাসা কি অন্যায় ? নাকি অপরাধ ? আমার জীবন টা কেন এমন হল ? আমি কি তোমার কাছে খুব বেশী কিছু চেয়েছিলাম, তোমার হৃদয়ে কি এতটুকু জায়গা ও আমার জন্য ছিল না ? তাহলে কেন এমন হল বন্ধু। আমি অপেক্ষায় আছি থাকব। তুমি আসবে বলে চেয়ে থাকি পথের দিকে। হয়তো আসবে হয়তো বা না….। তবুও বলে যাব বুকে হাত রেখে ভালবাসি তোমাকে, ভালবাসব শুধু তোমাকে। যদি অপেক্ষা করতে হয় সারাটি জীবন তাতেও আমার কোন আপত্তি নেই। অনেক আবোল তাবোল লিখলাম। যথারীতি তোমার খুজে বের হব। বাহিরে যেতে হবে। কখন তুমি চলে আসবে। ভাল থেকো, সুস্থ থেকো, অনন্ত কাল বেচে থাক। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা যেখানেই থাক যেন ভাল থাক। শাঁড়া তোমার মনে আছে কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্টানে তুমি যে নীল শাড়িটা পড়ে এসেছিলে ওহঃ কি যে সুন্দর লাগছিল। যেন আকাস থেকে নীল পরি নেমে এসেছে মাটিতে। খুলা চুলে তোমাকে দারুন লাগে, নীল রং তোমাকে খুব, খুব মানায়। এক দিন সেই নীল শাড়িটা পড়ে আসবে ? তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে চাঁদনী রাতে খোলা আকাশের নীচে তোমার হাত ধরে স্বপ্ন দেখতে। তুমি আসবে না ? কবে আসবে?

অপেক্ষায় থাকলাম………………..

 

প্রিতম

বেবীষ্টেন্ড, হবিগঞ্জ।

তারিখঃ ২০/১০/১৯৯৭ইং

 

 

অসমাপ্ত কথা সমাপ্ত করি আমি সাইফুদ্দিন জাবেদ।

Share on Facebook
Free WordPress Themes - Download High-quality Templates