Thursday , 13 December 2018
এই মূহুর্তেঃ-

খোয়াই থিয়েটার

হবিগঞ্জে প্রবীণ দল খোয়াই থিয়েটার অপসংস্কৃতি নয় চাই জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশ, এই শ্লোগানকে সামনে রেখে হবিগঞ্জ নাট্যচর্চার ক্ষেত্রে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক রূপে ১৯৮৩ ইংরেজী সনের ২রা ডিসেম্বর আত্মপ্রকাশ করে। তারা মঞ্চে আনে মামুনুর রশীদ রচিত নাটক ‘এখানে নোঙ্গর’। তখন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন মরহুম অধ্যাপক আবদআলকরিম। হবিগঞ্জ শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া নদী খোয়াই এর নামে জন্ম নেওয়া খোয়াই থিয়েটার এর মনোগ্রাম অংকন করেন তফাজ্জল আব্দাল। যা অদ্যাবধি খোয়াই থিয়েটার ধারণ করে চলছে। শুরুতে সৌখিন নাট্য চর্চার দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলে ও বর্তমানে পেশাদারী মনোভাব নিয়েই হবিগঞ্জে প্রবীণ নাট্য সংগঠন হিসাবে নাট্য আন্দোলনকে বিকাশের জন্য বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে যাচ্ছে। খোয়াই থিয়েটার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মরহুম অধ্যাপক আব্দাল করিম, জাহাঙ্গীর চৌধুরী, দেওয়ান মিনহাজ গাজী, সুভাশীষ ভট্টাচার্য চপল, তকাম্মল হোসেন বাহার, সোহান চৌধুরী, জিল্লুর রহমান খান মামুন, মহিউদ্দিন মফিজ, জ্যোতির্ময় দাস, সুভাষ চন্দ্র দেব, দেব কুমার চক্রবর্তী, তফাজ্জল আবদাল সহ আরো অনেকের অবদান আজও দলটি চলার পথে উৎসাহ দান করছে। পাশাপাশি নব্বই দশকের দিকে বেশ কিছু তরুণ প্রতিভাবান নাট্যকর্মীর পদচারণায় ও তাদের সাংগঠনিক নির্দেশনা ও বিবিধ কর্মকাণ্ডে খোয়াই থিয়েটারের নাট্য আন্দোলন আর ও বেগবান হয়। তাদের মধ্যে রঞ্জু পাল, রাজন চৌধুরী, তোফাজ্জল সোহেল, ইসমত আরা শাহীন, শাহ-আলম চৌধুরী মিন্টু, শফিউল আযম খান এনাম, নিপা বিশ্বাস, সৈয়দা সুলতানা, চ্যারেটি চক্রবর্তী (অকাল প্রয়াত) সহ আরো অনেকেই ছিলেন। তখন দর্শক নন্দিত বেশ কিছু নাটক ছিল। এর মধ্যে ময়নার চর, ওপারেও রাজাকার বেশ প্রশংসিত হয়। বেশ কিছু সফল নাটক মঞ্চায়নের ফলে খোয়াই থিয়েটার ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সদস্যপদ লাভ করে। ১৯৯১ সালের দিকে নতুন নাট্যকর্মী সংগ্রহ প্রক্রিয়ার ফলে কিছু নতুন প্রতিভাবান নাট্যকর্মীর আগমন ঘটে। বর্তমানেও এ প্রক্রিয়াটি চলমান। তখন নতুনদের সৃষ্টিশীল নিত্যনতুন ভাবনায় খোয়াই থিয়েটার নাট্য আন্দোলন আরো বেগবান হয়। খোয়াই থিয়েটার নাট্য উন্নয়নের জন্য বেশকিছু নাট্য কর্মশালার ও আয়োজন করে। হবিগঞ্জে এসব কর্মশালায় স্থাণীয়দের পাশাপাশি ঢাকার স্বনামধন্য নাট্যপ্রশিক্ষকরা প্রশিক্ষণ দেন। খোয়াই থিয়েটারের পার্থ প্রতীম সেন, স্বরূপানন্দ রায় চৌধুরী, উত্তম দেব, সুমিত দেব, অলিউর রহমান, প্রসেনজিৎ চৌধুরী শিবু, অভিজিৎ পুরকায়স্থ, সমু, সিদ্দিকী হারুন, শহীদ আহমেদ চৌধুরী জুয়েল, স্টেলিন সরকার নূপুর, ইকরাম চৌধুরী, সহ আরো বেশকিছু নবীন প্রবীন নাট্যকর্মীর প্রচেষ্টায় একের পর এক নতুন নাটক মঞ্চে আসে। ফলে খোয়াই থিয়েটার লাভ করে বাংলাদেশ গ্র“প থিয়েটার সদস্যপদ। তারা ২০০২ সালে স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী নাট্যৎসব আয়োজন করে। আপন ঐতিহ্যের মূলরুপের উৎস সন্ধানে প্রতি বছর আয়োজন করে লোকজ সংস্কৃতি উৎসব। হবিগঞ্জ বর্ণমালা খেলাঘর আসর এর বৈশাখের প্রভাতী অনুষ্ঠানের পর পরই খোয়াই থিয়েটারের লোকজ সংস্কৃতি উৎসব সারা দিন-রাতব্যাপী হবিগঞ্জবাসীর হৃদয়ে আনন্দের পরশ ছোঁয়ায়। ১৯৯১ সাল থেকে ২০০০সাল পর্যন্ত খোয়াই থিয়েটারের ছিল স্বর্ণালী অধ্যায়। এই সময় এসেছে অনেক নাট্যকর্মী। সে সময় নারীরাও এগিয়ে এসেছিলেন। অনেকেই তাদের মধ্যে প্রভাষিকা নাসরিন হক, লুৎফা আক্তার হ্যাপি, ফয়জুন নাহার নাসরীন, মিতু দত্ত, আকলিমা আক্তার চম্পা, পাপড়ি, সুমি আক্তার, হ্যাপি ভৌমিক সহ আরও অনেকে। তখন খোয়াই থিয়েটার মঞ্চে এনেছে একের পর এক নতুন নাটক ‘ইদাঁরা’, ঈশ্বরের আদালত, সুখের খোঁজে সুখলাল, কেনারাম বেচারাম প্রভৃতি। প্রযোজনার ক্ষেত্রে শুরু হয়েছিল পরীক্ষা নিরীক্ষা। বর্ণনাত্মক নাটকের সূত্রপাত সে সময়ই ঘটে। ২০০১সালে থিয়েটারের মৌলিক নাটক পার্থ প্রতিম সেন রচিত ও নিদের্শিত ‘পুতুল’ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী কর্তৃক ঢাকায় আয়োজিত জাতীয় নাট্যউৎসবে প্রদর্শিত হয়। যার রিহার্সেল ও পরীক্ষা নিরীক্ষার কাজ ২০০০সাল থেকেই চলছিল। ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্য কর্তৃক আয়োজিত পক্ষকালব্যাপী নাট্য উৎসব কাম প্রদর্শনী সহ মাদুরাই-এ আরো দুটি প্রদর্শনী করে নাটকটি ব্যাপক সফলতা পায়। বর্তমানে চলছে নাটকের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা। পশ্চাত্য ফর্ম ভেঙ্গে বাংলার মূলধারায় নাটক করার জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছে  বেশ কিছু নাট্যকর্মী। তাদের মধ্যে পুরাতনদের পাশাপাশি সুকান্ত গোপ, এমরান হোসেন, মোক্তাদির হোসেন, মাসুদ-উদ-দোলা নিক্সন, সৈয়দ হাসান ইমাম শাকিল, প্রমথ সরকার, মোঃ জোবায়ের, শিমন চৌধুরী, পিয়াস মিশন, তবারক হোসেন মোহন সহ আরও অনেকে নিজ প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছে। খোয়াই থিয়েটার তাদের ৪৬টি প্রয়োজনার প্রায় ৬০০টি প্রদর্শনী মঞ্চস্থ করেছে। তাদের ৩৯তম প্রয়োজনা সিদ্দিকী হারুন রচিত ও বাংলাদেশ গ্র“প থিয়েটার ফেডারেশানের সিলেট বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল নিদের্শিত মৌলিক নাটক ‘ভূমিপুত্র’ ইতিমধ্যে বাংলাদেশ শিল্পকলার আয়োজনে নাট্য উৎসবে ঢাকার জাতীয় নাট্যশালার এক্সপেরিমেটাল হলে প্রদর্শিত হয়। সিদ্দিকী হারুণ রচিত ও ড: মুকিত চৌধুরী নির্দেশিত নাটক দাওয়াল ছিল লোকনাট্য আঙ্গিকে রচিত বেশ প্রশংশিত নাটক। থিয়েটারের ৪৬তম প্রযোজনা শ্রী হিরেন্দ্র কৃষ্ণ দাশ রচিত ও ইয়াছিন খাঁন নির্দেশিত বিজয় মালা যাত্রাকে নাটকের আজ্ঞিকে মঞ্চায়ন বেশ সুনাম অর্জন করে। এছাড়াও ৪৫তম প্রযোজনার প্রেম ভালবাসা নাটকটি ও ছিল বেশ জনপ্রিয়। নাটকটি রচনা করেছেন বাংলাদেশের বিখ্যাত নাট্টকার মমতাজ উদ্দিন আহম্মেদ ও নির্দেশনা দিয়েছেন পার্থ সারথি রায়। বাংলাদেশ গ্র“প থিয়েটার আয়োজিত উৎসবে আমন্ত্রিত দল হিসাবে ঢাকা মহিলা সমিতি মঞ্চে খোয়াই থিয়েটারের ভূমিপুত্র মঞ্চস্থ হয়। সিলেট নাট্য মঞ্চ আয়োজিত উৎসবে ও প্রদর্শিত হয়। খোয়াই থিয়েটার ইতোমধ্যে থিয়েটার ল্যাব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ষ্টুডিও থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করেছে এবং নিজ মঞ্চে বেশ কিছু নিরীক্ষামূলক নাট্য প্রর্দশনী করছে। নাটকের মান উন্নয়নে সেট লাইট, ড্রেস ও বিভিন্ন বিষয়ের উপর প্রশিক্ষণ নিতে বাংলাদেশ গ্র“প থিয়েটার ফেডারেশন (দ্বিতীয়) নাট্যকার নির্দেশক ও সেট লাইট ডিজাইন কর্মশালায় পার্থ সারথি রায় খোয়াই থিয়েটার থেকে অংশগ্রহণ করেন। উক্ত প্রশিক্ষণে স্ব স্ব ক্ষেত্রে বিখ্যাত ব্যক্তিরা প্রশিক্ষণ দান করেন। ৬৪টি জেলা থেকে বাছাইয়ের মাধ্যমে মাত্র ৩০ জনকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষনের পর পার্থ সারথি রায় রচনা করেন নাটক “দোল” নাটকটি মঞ্চায়নের জন্য পান্ডলিপি ভিত্তিক কাজ চলছে। বড়দের পাশাপাশি শিশুরাও কিন্তু পিছিয়ে নেই সাকির আহমেদ তনুকা সেন মিমু, শাপলা মালাকার, পার্থ দেবনাথ, তানহা সুন্দরম থেকে অর্জন করেছে জাতীয় শিশু পুরস্কার। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ভাল কিছু করার রাজেশ দেব রন্টি, অজয় রায়, মিষ্টু পাল, রাজু চন্দ্র শীল, রাকিবা আক্তার যুথি, পার্থ দেব নাথ, সহ আর প্রায় শত শিশু। তাদের নিয়ে বিশ্বমানব হবার দৃঢ় প্রত্যায় নিয়ে বিশ্ব নাট্যঙ্গনে দৃপ্ত পদচারণা রেখে খ্য়োাই থিয়েটার ও সুন্দরম একই সাথে এগিয়ে যাচ্ছে সম্মুখেপানে ।

Share on Facebook
Free WordPress Themes - Download High-quality Templates