Thursday , 13 December 2018
এই মূহুর্তেঃ-

বি. রায় চৌধুরী

বি. রায় চৌধুরী

স্বাদেশ আন্দোলন ও ফুটবলাঙ্গঁনের কীর্তিমান

স্বাদেশ আন্দোলন ও ফুটবলাঙ্গঁনের 
কীর্তিমানের মুখচ্ছবি বি,রায় চৌধুরী

ভূপেন্দ্র রায় চৌধুরী। যিনি উপমহাদেশের ফুটবলাঙ্গঁনে বি,রায় চৌধুরী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ছাত্র জীবনেই স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দেন। তার বীরত্বগাঁথার কথা আজও অনেকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।
১৩১৯ বাংলা সালের ভাদ্র মাসের কোন এক শুক্রবারে হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং গ্রামের রঘুচৌধুরী পাড়ায় জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা বিশিষ্ট আইনজীবি স্বর্গীয় তারিনী চরণ চৌধুরী।
হবিগঞ্জ হাইস্কুলে দশম শ্রেণীতে অধ্যয়ন কালে ১৯৩১ সালে কংগ্রেসী আন্দোলনে যোগ দেন। হবিগঞ্জে নেতাজী সুভাষ বসুর সফরকালে তিনি জি,ও,সি এর দায়িত্ব পালন করেন। তিন বন্ধুকে নিয়ে তিনি ওই সনেই হবিগঞ্জ মহকুমা ট্রেজারী অফিসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করলে সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে এস,ডি,ও কোর্টে হাজির করে। মাত্র আধঘন্টার মধ্যে এস,ডি,ও নবীব আলী তাদেরকে পনোরো মাসের জেল দণ্ড প্রদান করে শিলচর কারাগারে প্রেরণ করেণ করেন। শিলচর জেলে ১১ মাস কারাভোগের পর সিলেট কারাগারে স্থানান্তর করে। চার মাস পর সেখান থেকে মুক্তি পেয়ে চার মাসের মাথায় পরীক্ষা দিয়ে প্রবেশিকা পাশ করেন। পরে হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজে ভর্তি হন। তৎসময়েই তিনি হবিগঞ্জ টাউন ক্লাব গঠন করেন এবং কৃতি ফুটবলার হিসেবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। এই খ্যাতির সুবাদে ঢাকা জগন্নাত কলেজের অধ্যক্ষ রায় বাহাদূর সত্যেন্দ্র নাথ দত্ত তার বরাবরে একটি টেলিগ্রাম করে তার খেলার যোগ্যতার প্রমাণ সাপেক্ষে কলেজ থেকে সকল সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কথা জানান। তিনি ঢাকায় যাবার পিতার অনুমতি না পেয়ে বাক্স ভেঙ্গে মাত্র ৫ টাকা নিয়ে ঢাকায় পাড়ি দেন। ঢাকার মাঠে নেমে খেলার নৈপুণ্য প্রদর্শন করে কলেজের উপাধ্যক্ষ ও স্পোর্টস ইনচার্জ এ,পি,গুপ্তের মন জয় করতে সক্ষম হন। তখন থেকেই কলেজ কর্তৃপক্ষ তার অধ্যয়ন সহ বিনা পয়সায় থাকার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ১৯৩৪ সালে তিনি আইকম পাশ করেন এবং ওই সালেই তার নেতৃত্বে কলেজ টিম ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় শীল্ড জিতে নেয়। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের উপাচার্য আর,সি,মজুমদার তার খেলার নৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়ে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বিশ্ব বিদ্যালয়ের দলে খেলার জন্য চাঁপ সৃষ্টি করেন। এর পর তিনি সেখানে ভর্তি হন এবং জগন্নাত হল থেকে এ্যাথলেটিক্স সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ সালে ইংল্যান্ডের ‘আইলিংটন কোরিন্থিয়ান’ক্লাব ঢাকা সফরকালে ঢাকা একাদশের সাথে এক প্রদর্শনী ম্যাচ খেলে। এ খেলায় লেফট উইং থেকে বি,রায় চৌধুরীর যোগান দেয়া বল থেকে পাখি সেনের দেয়া একমাত্র গোলে তাদের দল জয়লাভ করে। ভারতবর্ষ সফরকালে ইংল্যান্ডের এটিই ছিল তাদের একমাত্র পরাজয়। ১৯৩৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে বি,কম পাশ করেন। ওই সনেই কলকাতা ইষ্টবেঙ্গল ক্লাব থেকে আমন্ত্রণ পেলে সেই ক্লাবে যোগ দেন।
তখন থেকেই উপমহাদেশের ফুটবলাঙ্গনে বি,চৌধুরীর গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় শুরু।তাকে দলে নেয়ার জন্য ক্লাবগুলোর মধ্যে টানাটানি পড়তো। পরে তিনি প্রথম সারির ক্লাব মোহনবাগান ক্লাবে যোগদান করে টানা চার বছর খেলেন। কর্ণার শট থেকে প্রায়ই গোল পেয়ে তিনি কর্ণার শট স্পেশালিষ্ট এর আখ্যা পেয়েছিলেন। ১৯৪২ সনে মহাতœা গান্ধী ইংরেজ ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ডাক দিলে গান্ধী গ্রেফতার হন। তখন দেশব্যাপী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। বি,রায় চৌধুরী হবিগঞ্জ ফিরে এসে সিলেটের শশীভূষণ রায়,দূর্গাকুমার ভট্রাচার্য্য,শচীন্দ্র মোহন দত্ত,নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী প্রমূখ নেতৃবৃন্দের সাথে আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েন। এ আন্দোলনে হবিগঞ্জ থেকে ৭২ জন গ্রেফতার হয়েছিল।তিরিশের দশকে শিলচরে প্রথম ডিভিশন ফুটবললীগ শুরু হয়। শুরু থেকেই অবিভক্ত ভারতের সিলেট,ব্রাম্মণবাড়িয়া,কুমিল্লা,হবিগঞ্জ থেকে ফুটবল ক্লাব এই লীগে অংশগ্রহণ করতো। ওই ক্লাবগুলোর পক্ষে বানিয়াচংয়ের বি,রায় চৌধুরী ও তার ছোট ভাই শচীন রায় চৌধুরী,কবির মিয়া,স্বদেশ নাগ ও হবিগঞ্জের অমিয় ভট্টাচার্য্য,টুলু,রায় বিহারী,সুবোধ দত্ত নিয়মিত খেলতেন এবং অসামান্য নৈপুণ্য দেখিয়ে তারা কিংবদন্তী হয়ে ওঠেছিলেন।
চল্লিশের দশকে বি,রায় চৌধুরী এশিয়াটিক ব্যাংকের ম্যানেজার পদে চাকুরী নিয়ে শিলচরে যান। কিংবদন্তী ফুটবলার হিসেবে সেখানে বরণীয় ও সমদৃত হয়ে উঠেন এবং সংগঠক হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত করেন। ইন্ডিয়া ক্লাব শিলচরের পৃষ্ঠপোষকতায় মনোনীবেশ করেন। পরে তিনি এ ক্লাবের সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরে তিনি এ ক্লাবের আজীবন সদস্যপদ লাভ করেন।
পরর্বতীতে তিনি ‘অল ইন্ডিয়া ফেডারেশনের প্রেরণায় ১৯৪৬ সালে আসাম ফুটবল সংস্থা গঠন করেন। এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সভাপতি ছিলেন আসামের তদানীন্তন অর্থমন্ত্রী ফখরুদ্দীন আলী আহমেদ। যিনি পরবর্তীতে ভারতের রাষ্ট্রপ্রতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে তিনি দেশ বিভাগের পর গ্রামের বাড়ি বানিয়াচংয়ে এসে বসবাস শুরু করেন এবং মৃত্যু পূর্ব পর্যন্ত হোমিও চিকিৎসা দেয়াসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে জড়িত হয়ে পড়েন। কংগ্রেসী স্বদেশী আন্দোলনের ফ্রিডম ফাইটার হিসেবে ভারত সরকার কর্তৃক মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সম্মানী ভাতা পেয়ে আসছিলেন। ভারতে ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মহা সম্মেলনে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্ধিরা গান্ধী কর্তৃক তাম্র মুকুট লাভ করেন। ১৯৯২ সালের ২১ নভেম্বর নিজ বাড়িতে ৮০ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত রোগে মৃত্যুবরণ করেন।

Share on Facebook
Free WordPress Themes - Download High-quality Templates