Thursday , 13 December 2018
এই মূহুর্তেঃ-

জ্যোতির্ময় যারা

হবিগঞ্জের আলোকিত সন্তানেরা

সিপাহশালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন (রঃ)

সিপাহশালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন (রঃ)

সিপাহশালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন (রঃ)

হবিগঞ্জের ইতিহাসে উজ্জল নত্র সিপাহশালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন (রঃ)
মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। সে শ্রেষ্টত্ব অর্জন করতে মানুষকে অনেক সাধনা করতে হয়। আর সাধনা করে মানবতার চরম শিখরে উঠে অন্যায় দূরীভূত করে, সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সমাজ পুনর্গঠন করে মানবতার্থে প্রমান স্থাপন করে গেছেন যারা তাদের মধ্যে অন্যতম সিপাহশালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন (রঃ)। তাঁদের পরশে মানুষ পেয়েছে নবচেতনা।

সিলেট তথা বাংলায় মুসলিম জাগরণের পথিকৃত ৩৬০ আউলিয়া। তাদের মধ্যে হযরত শাহজালাল (রঃ) এর অন্যতম সঙ্গী ছিলেন নাসির উদ্দিন (রহঃ)। তিনি সিলেট বিজয়ে প্রধান সেনাপতির দায়িত্বে ছিলেন। শাহজালাল (রঃ) – এর নির্দেশে তিনি তরফ তথা বর্তমান হবিগঞ্জ বিজয় করেন। তিনি ঐতিহাসিক মুড়ারবন্দে রেখে গেছেন তাঁর শ্রেষ্ট কীর্তি। হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার খোয়াই নদী বিধৌত মুড়ারবন্দ নামক স্থানে তার মাজার অবস্থিত।

দিল্লীর বাদশাহ সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহ ১৩০৩খ্রিষ্টাব্দে সিকান্দার গাজীকে সেনাপতি করে গৌড় রার্জ জয়ের জন্য পাঠালেও তিনি প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হওয়ায় পরবর্তীতে নাসির উদ্দিন (রঃ) – কে সেনাপ্রধান করে প্রেরন করেন। পতিমধ্যে শাহজালাল (রঃ) এর সাথে তার দেখা হয় এবং সবাই মিলে গৌর জয়ে আসেন। রাজা গৌর গোবিন্দের সন্ধির ফলে শাহজালাল (রঃ) এর নির্দেশে তিনি নাসির উদ্দিন (রঃ) ভারী ধনুকে ‘জ্যা’ যোজন করেন এবং আযান দেন। ফলে রাজপ্রাসাদ গুলো ভেঙ্গে যায় এবং পরে তিনি তরফ তথা বর্তমান হবিগঞ্জ অঞ্চল জয় করতে যান।

বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার অধিকাংশ, ব্রাহ্মনবাড়ীয়ার কিয়দাংশ, ত্রিপুরার উত্তর পূর্বাংশ নিয়ে ছিল তৎকালীন তরফ রাজ্য। বর্তমান ভারত, বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী খোয়াই নদীর তীরে বাল্লর নিকটবর্তী বিষগাঁও নামক স্থানে ছিল তৎকাীলন তরফ রাজ্যের রাজধানী। সে সময় তরফ রাজ্যের শাসনকর্তা ছিলেন আচক নারায়ণ। তার রাজ্যে নূর উদ্দিন নামে এক লোককে তার ছেলের বিয়েতে গরু জবাই করার কারনে তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। এ খবর পেয়ে শাহজালাল (রঃ) নাসির উদ্দিন তিন হাজার পদাতিক এবং এক হাজার অশ্বরোহী সৈন্যবাহিনী নিয়ে তরফ জয়ের জন্য নির্দেশ দেন। তখন তার সাথে ছিলেন বার জন আউলিয়া। যার কারণে তরফ রাজ্যকে বার আউলিয়ার দেশ বলা হয়। এই বিশাল বাহিনী নিয়ে যখন নাসির উদ্দিন (রঃ) বিষগাঁয়ে পৌঁচেন তখন অবস্থা বেগতিক দেখে আচক নারায়ণ সন্ধির প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি তাতে রাজি হননি। তাই আচক নারায়ণ পলায়ন করে ত্রিপুরায় চলে যায়। ফলে তরফ রাজ্য সিপাহশালার নাসির উদ্দিন (রঃ) ও তার অনুসারীদেও অধীনস্থ হয়। যখন নাসির উদ্দিন (রহঃ) তরফের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন প্রথমে তিনি তরফ রাজ্যের সবচেয়ে উঁচু স্থানে অবতরণ করেন। যার কারণে ঐ স্থানটির নাম উচ্চ আইল বা উচাইল রাখা হয়। তা বর্তমানে একটি পরগণা। আচক নারায়ণের পলায়নের পর নাসির উদ্দিন (রঃ) সৈন্য – সামন্ত নিয়ে রাজধানীতে প্রবৃষ্ট হন এবং সেখানে অবস্থান করেন। কিন্তু সেই জলবায়ূ উপযোগী না হওয়াতে অনেক সৈন্য মারা যান। তাই তৎখনাৎ সেনাপতি সে স্থান থেকে ১০ মাইল দূরে বর্তমান লস্করপুর নামক স্থানে অবস্থান করেন। কথিত আচে লস্কর বা সৈন্য অবস্থানের কারণেই এই স্থানের নমি লস্করপুর রাখা হয়। তরপ রাজ্য জয়ের খবর দিল্লীতে পৌঁছলে সম্রাট নাসির উদ্দিন (রঃ) এর কাছে তরফ রাজ্যর শাসনভার অর্পণ করেন। তার সাতে যে ১২ আউলিয়া এসেছিলেন তাদের অনেকে বিভিন্ন স্থানে ইসলাম প্রচারার্থে চলে যান। তাদের মধ্যে শাহ গাজী (রঃ) এর মাজার রয়েছে চুনারুঘাটের গাজীপুরে, শাহ মজলিশ আমিন (রঃ) এর মাজার রয়েছে হবিগঞ্জের উচাইলে এবং সেখানে সুলতানী আমলের একটি মসজিদে রয়েছে। শাহ ফতেহ গাজী (রঃ) রয়েছে মাধবপুরের শাহজীবাজারে। পরে নাসির উদ্দিন (রঃ) মুড়ারবন্দনামক স্থানে ইবাদত বন্দেগীর জন্য আস্তানা করেন এবং সেখানেই তিনি ওফাত লাভ করেন। মুড়ারবন্দেই তাকে দাফন করা হয়। তার মাজার এখনও মুড়ারবন্দে রয়েছে। সারাদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ এখনও তার মাজার জিয়ারতের জন্য মুড়ারবন্দ আসেন। তাই মুড়ারবন্দেও এই মাজারকে সংরণ করা হলে একদিকে যেমন হবিগঞ্জের ঐতিহাসিক নিদের্শন সংরণ হবে, অন্যদিকে এটাকে পর্যটনীয় স্থান হিসেবে গঠন করা যাবে।

 

 

 

সৈয়দ সুলতান (১৫৫০-১৬৪৮)

জন্মস্থান – লস্করপুর, হবিগঞ্জ।

  • মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম মহাকবি সুলতান একাধারে কবি, সৈনিক, সুফীসাধক ও শাস্ত্রবেত্তা ছিলেন। তার শ্রেষ্ঠ ও বৃহত্তম কবিকীর্তি হচ্ছে ‘নবীবংশ’ . সৈয়দ সুলতান শিষ্যদের সুফীতত্ত্ব সংক্রান্ত জ্ঞান বিতরনের জন্য সুফীতত্ত্ব বিষয়ক বেশ কিছু গান রচনা করেছেন। জ্ঞান প্রদীপ, মারফতি জ্ঞান, রসুল বিজয়, শবে মেরাজ, জ্ঞান চৌতিশা, পদাবলী প্রভৃতি তাঁর অন্যান্য সাহিত্যকর্ম।

 

Shekh bhanu-shah-mazazar habiganjশেখ ভানু (১৮৮৯-১৯১৯)

জন্মস্থান- ভাদিকরা, লাখাই, হবিগঞ্জ।

  • ‘নিশীতে যাও ফুল বনে’ গানের রচয়ীতা মরমী সাধক, লেখক, কবি, তত্ত্ব কথার উদ্ভাবক ছিলেন তিনি। তিনি অনেক মরমী গান এর  রচয়ীতা মরমী সাধক, লেখক, কবি, তত্ত্ব কথার উদ্ভাবক ছিলেন তিনি।  “নিশিথে যাইও ফুল বনে” গানের রচয়িতা মরমী সাধক লেখক কবি তত্ত্ব কথার উদ্ভাবক শেখ ভানু শাহ হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলার বামৈ ইউনিয়নের ভাদিকাড়া গ্রামে ১৮৪৯ খ্রিঃ জন্মগ্রহণ করেন । পেশায় বেপারি ভানু শাহ মেঘনা নদীতে ধানের নৌকা নিয়ে গন্তব্যে যাওয়ার সময় দেখেন একটি মৃত দেহের উপর বসে কাক লাশের চোখ ঠুকরিয়ে খাচ্ছে । এ দৃশ্য দেখে তিনি জগৎ সংসারের মায়া মমতা ও মোহ ত্যাগ করে আল্লাহর পথে গৃহত্যাগী হয়ে যান । রচনা করেন অনেক আধ্যাত্মিক পংক্তিমালা । ১৯৩৩ খ্রি কলকাতায় বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সাহিত্য সম্মেলনে মরমী কবিদের মধ্যে যে চারজনকে দার্শনিক হিসাবে উল্লেখ করেন তাঁরা হলেন লালন শাহ, শেখ ভানু শাহ, শেখ মদন শাহ ও হাসন রাজা । তিনি ১৯১৯ খ্রিঃ ইন্তেকাল করেন । তিনি এলাকায় একজন সাধক পীর হিসাবে সম্মানিত ।

 

বৃন্দাবন চন্দ্র দাশ (১৮৫০-১৯৩২)

জন্মস্থান- বিথঙ্গল,বানিয়াচং, হবিগঞ্জ।

 

    • বৃন্দাবন চন্দ্র দাস,পিতা মৃত বিজয় কৃষ্ণ দাস, গ্রাম বিথঙ্গল । জন্ম স্থান বিথঙ্গল বড় আখড়া সংলগ্ন পশ্চিমের বাড়ী যা উনার পিতামহের বাড়ী। পেশা মিরাশদারী, মহাজনী , মহালদারী ওন ব্যবসা (শেয়ার হোল্ডার চিত্ত রঞ্জন কটন মিলস , শেয়ার হোল্ডার অল ইন্ডিয়া সুগার মিলস লিঃ সহ অন্যান্য ব্যবসায় জড়িত ছিলেন । জন্ম ১৮৫০ ইং ভাদ্র  মাস, মৃত্যু ১৯৩৩ ইং ভাদ্র মাস, শিক্ষাগত যোগ্যতা তৎকালীন পঞ্চম শ্রেনী পাশ। তিনি ছিলেন বিচক্ষণ সৎ এবং মিতব্যয়ী এবং শিক্ষানুরাগী। তিনি খুবই সাধারন জীবন যাপন করতেন এবং অন্যান্য জমিদারদের চেয়ে একটু ব্যতিক্রম জীবনযাপন করতেন, যার মধ্যে ছিল গরীবদের প্রতি ঊনার সেবামূলক মনোভাব, অত্যাচারী জমিদারদের এবং ব্রিটিশ সরকারের বিরোধিতার প্রমান তাঁর জীবনীতে পাওয়া যায়। তিনি ব্রিটিশ সরকার প্রদত্ত উপাধি গ্রহন করলেও নিজ নামের সঙ্গে এ সকল উপাধি যুক্ত করেন নি যেমন চৌধুরি রায় সাহেব এবং ব্যাংকাস উপাধি তারা উনার নামের পূর্বে এবং পরে যুক্ত করলেও তিনি তা কখনও নিজে লিখেন নাই। তিনি একজন সাধারন কৃষকের সন্তান হিসাবে জীবনযাপন করতেন কিন্তু সবসময় জমিদারদের নিষ্পত্তি নিলামে ক্রয়  করে তালুকের পরিমাণ বৃদ্ধি করতেন। এইভাবে তিনি ৫৬টি তলুকের মালিক ছিলেন। ১৯৩১ সালে তৎকালীন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গের উদ্যোগে বর্তমান বৃন্দাবন কলেজের উত্তর সীমানায় হবিগঞ্জ কলেজ নামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়। এই কলেজটির রেজিস্ট্রেশনের জন্য ১০০০০/- টাকা প্রয়োজন হয়। হবিগঞ্জ জেলায় অনেক ধনী লোকদের অবস্থান সত্তেও এগিয়ে আসেন সামান্য পঞ্চম শ্রেনী উত্তীর্ণ বৃন্দাবন চন্দ্র দাস। বৃন্দাবন চন্দ্র দাসের জন্যই কলেজটি রেজিস্ট্রেশন প্রাপ্ত হয়। প্রথম অধ্যক্ষ বিপিন বিহারী দে , আসাম লোকাল বোর্ডের সদস্য সুনেন্দ্র লাল দাস চৌধুরী , এ্যাডঃ বিনোদ লাল রায় কলেজটির নামকরণ করেন বৃন্দাবন চন্দ্র কলেজ। পরবর্তীতে বৃন্দাবন চন্দ্র দাসের উদ্যোগেই নাম হয় বৃন্দাবন কলেজ। কলেজটি পরিচালনার জন্য উনি নিজস্ব ১৪/১৫ হাল জমি দান করেন। ১৯৩১ সালের সেই কলেজটি আজ হবিগঞ্জ জেলার মাঝে একটি নামকরা কলেজ। উনি এক পুত্র এবং দুই কন্যা সন্তানের জনক। বৃন্দাবন চন্দ্র দাসের অনেক গুণাবলীর মাঝে অন্যতম  উনি অত্যন্ত মাতৃভক্ত ছিলেন। হবিগঞ্জ নাগরিক কমিটি এমন একজন শিক্ষানুরাগীকে সম্মান প্রদর্শন করতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করছে । আজ এই সম্মাননা গ্রহন করবেন বৃন্দাবন চন্দ্র দাসের চতুর্থ প্রজন্মের কৃতি সন্তান প্রাকৃত জনের চেয়ারম্যান বিজন বিহারী দাস।

 

Bipin Chondra Pal

Bipin Chondra Pal

বিপিন চন্দ্র পাল (১৮৫৮-১৯৩২) জন্মস্থান- পৈল, হবিগঞ্জ।

• প্রেসিডেন্সি কলেজ ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বিপিন চন্দ্র পাল ছিলেন বিশ্বের বাগ্মি নেতা, অখন্ড ভারত আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা। তার লিখিত ২৫ টির ও বেশি বই বিশ্বের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে পড়ানো হয়। বিপিন পাল ১৮৫৮ খ্রি. ৭ নভেম্বর হবিগঞ্জ সদরের পৈল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সিলেটের প্রাইজ স্কুল, হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি কলেজ, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়েও ধর্মতত্ত বিষয়ে লেখাপড়া করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় ১৮৭৭ খ্রি. কলকাতায় শ্রীহট্ট সম্মিলনি স্থাপিত হয়। ১৮৮০ খ্রি. প্রকাশ করেন সিলেটের প্রথম বাংলা সংবাদপত্র পরিদর্শন। এছাড়া তিনি বেঙ্গল পাবলিক অপিনিয়ন, স্বরাজ, সোনার বাংলা, হিন্দু রিভিউ, ইনডিপেনডেন্ট, ডেমোক্রেট, হিন্দু রিভিউ সহ অনেক পত্রিকায় সাংবাদিক ও সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৮৮০ খ্রি. সিলেটের মুফতি স্কুলের ভগ্নাংশ নিয়ে সিলেট জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন।

 

সৈয়দ মুছা, জন্মস্থান- লস্করপুর, হবিগঞ্জ সদর।

  • তিনি মধ্যযুগের একজন বিশিষ্ট কবি ছিলেন।

 

মনসা মঙ্গল , জন্মস্থান- হবিগঞ্জ।

  • তিনি একজন নামকরা কবি ছিলেন।

 

রামনাথ বিশ্বাস (১৮৯৪-১৯৫৫)

জন্মস্থান- বিদ্যাভূষন, বানিয়াচং, হবিগঞ্জ।

চিরকুমার ও বাংলার প্রথম বিশ্বজয়ী ভূপর্যটক ছিলেন। তিনি দীর্ঘ সাইকেল ভ্রমনের কাহিনী নিয়ে গল্প ও উপন্যাস মিলিয়ে ৪০ টির ও বেশি বই লিখেন। যেখানে রয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার ১২ কিঃমিঃ পথভ্রমনের অভিজ্ঞতা। ভূঃ পর্যটক রামনাথ বিশ্বাস এর জম্ম ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে ১৩ জানুয়ারি হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার বিদ্যাভূষন পাড়ায়। স্থানীয় হরিশ চন্দ্র হাইস্কুলের ৬ষ্ট শ্রেণীর ছাত্র অবস্থাতেই স্কুল ছেড়ে বিপ্লবী দলে যোগদেন। তার মনে ছিল বিশ্বকে দেখার এক দূর্বার আকাংখা। আর এ উদ্দেশ্যেই ১৯৩১ খ্রি. ৭ জুলাই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন বিশ্ব ভ্রমণে প্রথমে সিংগাপুর, কুয়ালালামপুর, জিত্রা শিয়াংলুং হয়ে প্রবেশ করেন থাইল্যান্ডে। থাইল্যান্ড থেকে ইন্দোচীন, চীন, হংকং, কেন্টন, সাংহাই হয়ে পিকিং। পিকিং থেকেমাঞ্চুকো, মুকদেন, আন্তং হয়ে কোরিয়া। কোরিয়া হতে জাপান, জাপান হতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হতে কানাডা এসব দেশ জয় করে পাড়ি জমান ফিলিপাইন, বালিজাভা, সুমাত্রাসহ ইন্দোনেশিয়ার নানা দ্বীপপুঞ্জে। ইন্দেনেশিয়া সরকার তাঁকে তেমন সহযোগিতা করেননি। পরে সেখান থেকে আবার ফিরে আসেন সিংগাপুরে। সিংগাপুর থেকে আপন দেশে। তারপর খানিকটা বিরতি। পরবর্তীতে ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে ১ জানুয়ারি দ্বিগুন উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে দ্বিতীয়বারের মত বের হন বিশ্ব ভ্রমণে। প্রথমে সিংগাপুর, সিংগাপুর থেকে পিনাং তার পর সমগ্র ভারতবর্ষ ঘুরে দেখেন পরম আগ্রহে। উপমহাদেশে প্রায় এক বৎসর অবস্থান শেষে আফগানিস্তান, ইরান, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও তুরস্ক ভ্রমণ। তারপর শুরু করেন ইউরোপ দেখা। প্রথমেই বুলগেরিয়া। পরে যুগোশ্লাভিয়া, চেকোশ্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরী, অষ্ট্রিয়া, হলান্ড, জার্মানী, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, গ্রেট ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড। এই দীর্ঘ পথ ভ্রমণ শেষে ১৯৫০ সালে হবিগঞ্জের মানুষটি স্থায়ীভারে বসবাস শুরু করেন কলকাতায়। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে ১ নভেম্বর সেখানেই এই চিরকুমার ও বিশ্বের প্রথম বিশ্বজয়ী পর্যটক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

 

 

সৈয়দ মুজতবা আলী (১৯০৪১৯৭৪) জন্মস্থান- করিমগঞ্জ, আসাম।

 

  •  প্রখ্যাত রম্য সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী ১৯০৪ খ্রীষ্টাব্দের ১৩ সেপ্টেম্বর পিতার তৎকালীন কর্মস্থল আসামের করিমগঞ্জে জম্মগ্রহণ করেন। তার পৈত্রিক নিবাস হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার উত্তরপুর প্রামে। পিতা সৈয়দ সিকান্দর আলী ও মাতা বেগম আমাতুল মান্নান । সৈয়দ মুজতবা আলী ১৯২৬ সালে বিশ্বভারতীর প্রথম ব্যাচের এবং বাহির থেকে আসা প্রথম ছাত্র হিসাবে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি, কলকাতা বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয়, শান্তি নিকেতন, আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়, মিশরের আল-আজাহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। ১৯২৭ খ্রি. তিনি আফগানিস্তানের শিক্ষা বিভাগে চাকুরী নেন এবং ১৯৩২ খ্রি. জার্মানীর বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন। সৈয়দ মুজতবা আলী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় , বারুদা কলেজ ও বিশ্ব ভারতীতে অধ্যাপনা ছাড়াও বগুড়ার আযিযুল হক কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ইন্ডিয়া কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনের সচিব ও আকাশবানীর স্টেশন ডিরেক্টর হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিশ্বের ১৫টি ভাষা আয়ত্ব করেছিলেন। ভ্রমণ করেছেন অনেক দেশ। অবিশ্বাস্য, পঞ্চতন্ত্র, চাচা কাহিনী, দেশ বিদেশ,  শবনম, ধুপছায়া, ময়ুরকন্ঠী, মুসাফির তার কালজয়ী রচনা। তিনি ১৯৭৪ খ্রি. ১৯ ফেব্রুয়ারী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাষ ত্যাগ করেন । ঢাকা আজিমপুর কবরস্থানে শহীদ বরকত এর কবরের পাশে তাঁর সমাধি রয়েছে।

 

Abul Hussain Chowdhury ডাঃ আবুল হোসেন চৌধুরি

(১৯০৮-১৯৭৪) জন্মস্থান- দেবপাড়া, নবীগঞ্জ, হবিগঞ্জ।

১৯৩১ সালে আসামের ডিরুগড হোয়াইট হল থেকে এলএমপি পাস করেন। ১৯৪৩ সালে হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং এ ম্যালেরিয়ার মতো এক প্রকার জ্বরের প্রাদুর্ভাব ঘটে। ১৯৪৪ সালে তিনি গবেষনা ও পর্যবেক্ষন করে সিদ্ধান্ত নেন এটা সিবেপ্রু স্পাইনান ফিভার। পরবর্তীতে এটি স্বীকৃতি পায়, সিবেপ্রু স্পাইনান ফিভার এর অব্যর্থ ঔষধ মেন সেরা হোসাইনি।

 

 

 

হেমাঙ্গ বিশ্বাস (১৯১২-১৯৮৭) জন্মস্থান- মিরাশি, চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ।

 Hemango Biswasহেমাঙ্গ বিশ্বাস : একজন বাঙালি সঙ্গীতশিল্পী ও সুরকার। মূলত লৌকিক ধারার অনুসারী। অনুবাদে ফোকসুরের ব্যবহারে, গণসঙ্গীত রচনায়, সুর সংযোজনার দক্ষতায় হেমাঙ্গ বিশ্বাস বাংলা গণনাট্য সঙ্গীতে এক নতুন প্রবাহের সৃষ্টি করেন। লোকসঙ্গীতকে কেন্দ্র করে গণসঙ্গীত সৃষ্টির ক্ষেত্রে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য।

  • হেমাঙ্গ বিশ্বাস ১৪ জানুয়ারী ১৯১২ সালে বর্তমান বাংলাদেশের সিলেটের মিরাশিতে জন্মগ্রহণ করেন। হবিগঞ্জ হাইস্কুল থেকে পাশ করার পর তিনি শ্রীহট্ট মুরারিচাঁদ কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ১৯৩২ খ্রীস্টাব্দে কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন। ১৯৩৫ খ্রীস্টাব্দে কারাবন্দী থাকাকালে তিনি যক্ষারোগে আক্রান্ত হন এবং সেই কারণে তিনি মুক্তি পান। ১৯৪৮ খ্রীস্টাব্দে তেলেঙ্গেনা আন্দোলনের সময়ে তিনি আবারও গ্রেফতার হন এবং তিন বছর বন্দী থাকেন।

    ১৯৩৮-৩৯ খ্রীস্টাব্দে বিনয় রায়, নিরঞ্জন সেন, দেবব্রত বিশ্বাস প্রমূখের সাথে ভারতীয় গণনাট্য সংঘ বা আই.পি.টি.এ গঠন করেন। পঞ্চাশের দশকে এই সংঘের শেষ অবধি তিনি এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।

    ১৯৪২ খ্রীস্টাব্দে বাংলার প্রগতিশীল লেখক শিল্পীদের আমন্ত্রণে তিনি প্রথম কলকাতায় আসেন সঙ্গীত পরিবেশন করতে। ১৯৪৩ খ্রীস্টাব্দে তাঁর উদ্যোগে এবং জ্যোতিপ্রকাশ আগরওয়ালের সহযোগিতায় সিলেটে গণনাট্য সংঘ তৈরি হয়। স্বাধীনতার আগে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সুরকারদের মধ্যে তিনিই ছিলেন প্রধান। সেই সময়ে তাঁর গান তোমার কাস্তেটারে দিও শান, কিষাণ ভাই তোর সোনার ধানে বর্গী নামে প্রভৃতি আসাম ও বাংলায় সাড়া ফেলেছিল।

    চীন-ভারত মৈত্রীর ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল। দু’বার তিনি চীনে গিয়েছিলেন। মাস সিঙ্গার নামে নিজের দল গঠন করে জীবনের শেষ দিকেও তিনি গ্রামে গ্রামে গান গেয়েছেন। তিনি কল্লোল, তীর,লাললন্ঠন, প্রভৃতি নাটকে সঙ্গীত পরিচালনা করেন।

    তাঁর ঐতিহাসিক মাউন্টব্যাটন মঙ্গলকাব্য গানটির রচনা কাল ১৯৪৮। পঞ্চাশের দশকে তাঁর গানে দেশবিভাগের যন্ত্রণার পাশাপাশি সংগ্রামের কঠিন শপথে উদ্দীপ্ত হওয়া যায়। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনে তিনি লিখলেন, শোন দেশের ভাই ভগিনী শোন আচানক কাহিনী, কাঁদো বাংলা জননী। আর শহরে এই গানটি ঢাকার ডাক শিরোনামে গীতিকার চিত্রিত করেছেন।

    ১৯৬৫ খ্রীস্টাব্দে অনুবাদ করেন আমরা করবো জয় মার্কিন লোকসঙ্গীত শিল্পী পিট সিগারের গাওয়া সেই জনপ্রিয় গানটি। ১৯৬৪-তে পারমাণবিক যুদ্ধের প্রতিবাদে রচনা করেন শঙ্খচিল গানটি।

    হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান এবং শঙ্খচিলের গান তাঁর গানের সঙ্কলন। বাংলা ও অসমিয়া ভাষায় তাঁর লিখিত গ্রন্থ লোকসঙ্গীত শিক্ষা।

    ২২ নভেম্বর ১৯৮৭ সালে তিনি পরলোক গমন করেন।

    গতবছর থেকে শুরু করে এ-বছর শতবর্ষ বা সার্ধশতবর্ষের যে মহোৎসব আমরা ক্রমাগত লক্ষ করে আসছি, তাতে কার প্রতি কার কতটা শ্রদ্ধা বা সেই সমস্ত নিবেদন কতটা আন্তরিক, তা নিয়ে সন্দেহ বিস্তর৷ আর, কে কাকে শ্রদ্ধা জানাবে, সেই তালিকাটিও যে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থ-প্রণোদিত, সেসব অনুভব করার ‘সৌভাগ্য’-ও আমাদের হয়েছে৷ যে সমস্ত মনীষীরা শতবর্ষ কিংবা সার্ধশতবর্ষের ফলকটি স্পর্শ করলেন, এই জাতীয় প্রতিবেদন রচনায় তাঁদের অবদানের কোনও উৎকর্ষ যেমন সাধিত হয় না, তেমনি, কোন রাজনীতি কাকে ব্রাত্য করে রাখল, তাতেও তাঁদের উচ্চতা বিন্দুমাত্র  কমে না৷ কিন্তু তাঁদের স্মরণ করলে আমাদের আত্মিক ও বৌদ্ধিক কিছু লাভালাভের সম্ভাবনা থাকে যেহেতু, সে কারণেই আমরা ওই মনীষীদের কথা মনে করতে চাই৷ একে নিজেদের স্বার্থ বললেও খুব একটা আপত্তি করার কিছু নেই৷ তবে যাই হোক না কেন, এ-সমস্তই প্রযুত্তু হতে পারে যদি আমাদের আন্তরিক সদিচ্ছা থাকে, সেই প্রশ্নে- ব্যবসা বা কাগজে একটা কপি লেখার উদ্দেশ্যে নয়৷ সেটা যাদের মনোবাসনা, তারাই চিন্তা করে কে কার দিকে তাকাবে আর কে অচ্যুত। যেমন একটি উদাহরণ দিই- বাংলার দুই প্রবাদপ্রতিম সংগীত-ব্যক্তিত্ব গণসঙ্গীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও বিশিষ্ট লোককবি নিবারণ পণ্ডিত—এ বছর এঁদের দু-জনেরই শতবর্ষ৷ হেমাঙ্গ বিশ্বাসের তো আবার মৃত্যুরও রজতজয়ন্তী৷ নিবারণ পণ্ডিতের মৃত্যুর পঁচিশবছর পূর্তি হয়ে গেছে দু-বছর আগেই৷ কিন্তু কোন কোন  সংবাদমাধ্যম হেমাঙ্গ বিশ্বাসের শতবর্ষের কথা উল্লেখ করলেও নিবারণ পণ্ডিতের কথা আজ পর্যন্ত কেউ উল্লেখ করেনি। সে যাই হোক না কেন, এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক পত্র-পত্রিকার কথা না হয় বাদই দিলাম, নিবারণ পণ্ডিতের কথা গণশক্তি বা তথাকথিত বাম মতাদর্শে বিশ্বাসী পত্রিকাসমূহ একবার উচচারণ করল না কেন? ষাট কিংবা কিছুকাল আগের লাল বাংলার ততোধিক লাল প্রগতিশীল সংগঠন সমূহ? সন্দেহ জাগে, বাংলায় গণসংগীতের স্রষ্টা বলে যিনি অন্যতম, তাঁকে মনে আছে তো এদের? আসলে এই সন্দেহটা অমূলক নয়৷ কেন না, একসময়ের যে-অবস্হান ছিল বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির, সেখান থেকে তারা হাজার যোজন সরে এসেছে বহুকাল আগেই৷ ফলত এখন যারা বামপন্হী বলে নিজেদের মনে করে থাকে, তারা পার্টির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কোনও ইতিহাসই জানে না৷ অবশ্য জানার কোনও প্রয়োজনও নেই৷ কেন না, গত ২০-২২ বছর ধরে পার্টির কর্মপদ্ধতি যে-আবহে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে, তাতে ওইসমস্ত ইতিহাস জানার একটুও সুযোগ ছিল না৷ বলা ভাল, সে সুযোগ দেওয়া হয় নি৷ দিলে পার্টির অবস্হান আজ এরকম হত না৷ আজকের সাংস্কৃতিক ক্যাডাররা আর নিবারণ পণ্ডিতের নামও জানে না৷ যদিও এর পুরোটা দায়ই বামপন্হীদের৷

    গণসঙ্গীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস বা লোককবি নিবারণ পণ্ডিতের অবদানের় কথা বাদ দিন, তাঁদের নামের সঙ্গেও উপরি -উত্তু কারণেই এখনকার প্রায় কোনও বামপন্হী সাংস্কৃতিক কর্মীর পরিচয় নেই৷ তাও বিষয়টা আজ এমনই দাঁড়িয়েছে যে, বামপন্হীদের মধ্যে যদি এখন কোনও সাংস্কৃতিক কর্মী খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে সেটাই যেন একটা বিরাট ব্যাপার৷ কিন্তু এই প্রসঙ্গেই হেমাঙ্গ বিশ্বাস ‘গণনাট্য সংঘ বনাম গণনাট্য আন্দোলন’ শীর্ষক একটি নিবন্ধে লিখেছিলেন, “১৯৪৩ -এ প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই এ বিষয়ে দুটি লাইনের সংঘাত প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষভাবে চলে আসছে৷ একটা প্রশ্ন বারে বারে আমাদের সামনে দেখা দিয়েছে–গণনাট্য সংঘ ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখা না কমিউনিস্ট শিল্পীদের নেতৃত্বে একটি গণপ্রতিষ্ঠান?…আজ বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী কার্যতঃ সি পি বি-র একটি সাংস্কৃতিক শাখাতে পরিণত হয়েছে, গণপ্রতিষ্ঠানের রূপ তার নেই৷ তার মানে কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখা–ব্যাপারটি যে গ্রহণযোগ্য নয়, তা হেমাঙ্গবাবু তখনই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন৷

    ষাট দশকের মাঝামাঝি সময়ে উৎপল দত্তের ‘কল্লোল’ নাটকের গানে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সুরারোপ বাংলার সামগ্রিক ইতিহাসে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, তা যদি এখনকার বামপন্হীরা জানতেন, তাহলে তাঁদের আজ এই দুর্দশা হয় না৷ একজন মনীষীকে জন্মদিন বা শতবর্ষে স্মরণ করা মানে যে শুধু তাঁর মূর্তিতে মালা দেওয়া নয়, তাঁর গোটা কর্মজীবন ও অবদান সম্পর্কে অবহিত হওয়া ও সত্যিকারের শিক্ষা নেওয়া–এই আসল কথাটা বামপন্হীরা কেন ভুলে যাবেন, প্রশ্ন তো এখানেই৷ তবু হেমাঙ্গবাবু বা তাঁর নাম এখনও কিছুটা স্মরণের মধ্যে আছে, কিন্তু নিবারণ পণ্ডিতের নাম এখনকার ক-জন বামপন্হী জানেন? সত্যি কথাটা বুকে হাত দিয়ে বলুন তো দেখি? জানলে এ-বছর যে তাঁর শতবর্ষ–এই তথ্যটা ছাপার অক্ষরে তো দূরের কথা, কোনও আলোচনায়ও শোনা গেল না কেন?

    লোককবি নিবারণ পণ্ডিতকে লেখা হেমাঙ্গ বিশ্বাসের চিঠি-প্রসঙ্গে আসার আগে স্বয়ং লোককবির আত্মকথন শোনা যাক৷ গণনাট্য পত্রিকার ১৯৮১ সালের জানুয়ারি-মার্চ সংখ্যায় ‘কবির আত্মকথন’ শীর্ষক নিবন্ধে নিবারণ পণ্ডিত লিখেছেন, “১৯১২ সালের ২৭ শে ফেব্রুয়ারী আমার জন্ম৷ জেলা ময়মনসিংহ, মহকুমা কিশোরগঞ্জ, গ্রাম সগড়া৷ আমাদের পরিবার কৃষিনির্ভর ছিল৷ তবে আমার বাবা ভগবানচন্দ্র পণ্ডিত তাঁর ‘পণ্ডিত’ উপাধি পেয়েছিলেন শিক্ষকতা করার জন্য৷ আমার বয়স যখন বছর দশেক তখন বাবা মারা যান৷ দিন যাচিছল কোনোমতে, কিন্তু পরপর কয়েকবছর অজন্মার ফলে আমাদের মা-বেটার সংসারও অচলপ্রায় হল৷ বিড়ি বেঁধে কিছু আয়ের চেষ্টা করেছি ঐ সময়টাতে৷ পরে দেশত্যাগী হয়েও ঐ বিড়ি সম্বল করেছিলাম৷ কিশোরগঞ্জের রামানন্দ সুকলে সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা আমার৷ কিশোর বয়সেই রথতলার জনসভায় মাঝে মাঝে যেতাম বন্ধুদের সাথে৷ ছোট বয়সেই আমি গ্রাম্য গান কবিতা রচনা করতে পারতাম বলে গায়ক ও বাদকরা আমাকে দলে নিয়ে যেতেন৷” আর পরবর্তিকালে নিবারণ পণ্ডিতকে লেখা একটি চিঠিতে হেমাঙ্গ বিশ্বাস জানাচেছন, “আপনি আমাদের মধ্যে সত্যিকারের জনগণগীতিকার৷ শ্রমজীবী জনতা থেকে কোনওদিন বিচিছন্ন হন নি৷ একই হাতে বিড়ি বানিয়ে ও গান বানিয়ে সংগ্রাম করেছেন৷ সুদীর্ঘ ৩০ বছরেরও বেশী কাল যাবৎ জনজাগরণে আপনার যে অমূল্য অবদান–তাতে আপনাকে নিরাময় করার জন্য জনগণের কাছে অর্থসাহায্য চাইবার দাবী আপনার সবচেয়ে বেশি…আপনি মরে গেলেও কোন সরকারি বা আধা সরকারি দান গ্রহণ করতে পারেন না জানি, তাহলে তো দু’শ টাকার সরকারি ‘স্বাধীনতা যোদ্ধার’ পেনসন ভোগ করতে পারতেন৷” আর একটি স্মৃতিচারণায় নিবারণবাবু সম্পর্কে তিনি জানিয়েছেন, “নিবারণ পণ্ডিত গণনাট্যে এসে গান লেখেন নি, তিনি কৃষক আন্দোলনে থেকে গান লিখেছেন৷ পরে তাঁকে গণনাট্যে নিয়ে আসা হয়৷” আসলে ১৯১৪ সালে ঢাকায় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার প্রেক্ষিতে নিবারণ পণ্ডিত রচিত একটি গানই তাঁকে পরিচিতি দেয়৷ সেই বিখ্যাত গানটি হল–“…শুনতে পাই ঢাকা সরে, মানুষে মানুষ মারেয়ঘর পোড়ায় দিন দুপুরে, করে নানা অত্যাচারয়যে যাহারে যেথায় পায়, ছুরিকাঘাত করে গায়য়পিছন থেকে মারে মাথায়, নাই তার কোন প্রতিকার৷” কমিউনিস্ট পার্টির কৃষক আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আগেই তিনি গান বাঁধতেন, গাইতেন৷ পরবর্তিকালে ১৯৪৫ সালে ময়নসিংহ জেলার নেত্রকোনায় সারাভারত কৃষকসভার নবম সম্মেলন উপলক্ষে তিনি গ্রামে গ্রামে গান গেয়ে প্রচার চালান৷ আর, ওই সময়েই গারো পাহাড় এলাকার হাজং উপজাতিভুত্তু চাষিদের টংক প্রথা বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছিল৷ ওই আন্দোলনের স্বপক্ষে তিনি গান রচনা করেন ও কৃষকদের সংগঠন করে বিভিন্ন এলাকায় প্রচার চালান৷ বাংলাদেশে থাকাকালীন ব্রিটিশ রাজত্বের অবসানের পরও কমিউনিস্টদের প্রতি চরম অত্যাচার করত আনসার বাহিনী, তার শিকার হয়েছিলেন নিবারণবাবুও৷ ১৯৫০ সালে তিনি ভারতে চলে আসেন৷ প্রচুর গান তিনি রচনা করেছেন৷ সংগীত সম্পর্কিত অনেক গ্রন্হও তাঁর আছে৷ কিন্তু সমস্তই গানেই তাঁর চরিত্র প্রধানত প্রতিবাদীর৷ বাংলা গণসংগীতই হোক আর প্রতিবাদী গানই হোক–বাংলা সংগীতে নিবারণ পণ্ডিতের অবদান অবিস্মরণীয়৷

    হেমাঙ্গ বিশ্বাস এবং নিবারণ পণ্ডিত–এই দুই কিংবদন্তীই এবার শতবর্ষে পদার্পণ করলেন৷ একইসঙ্গে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মৃত্যুর রজতজয়ন্তী উদযাপনের মুহূর্তও সমাগত৷ বাংলা গান তথা সংস্কৃতির জগতটিকে এই দুই মহান শিল্পী যে-মর্দায় উন্নীত করে গিয়েছিলেন, তাকে যথাযোগ্য সম্মান জানানোর একটি প্রাসঙ্গিকতা আমাদের কাছে উপস্থিত। ভ্রান্ত রাজনৈতিক চেতনায় সংস্কৃতি চর্চার  যে-অভ্যাসকে গত দু-আড়াই দশক ধরে এই রাজ্যে প্রায় বলপূর্বক ব্রাত্য করে রাখা হয়েছিল, তার ফলে বাঙালির প্রভূত ক্ষতি হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যেই৷ সরকার বদল হলে রাজ্যের সামগ্রিক পরিকল্পনার একটা বদল ঘটে অবশ্যই৷ তা মানুষের চিন্তা-চেতনার উপরেও প্রভাব ফেলে৷ সেটা সম্প্রতি এই রাজ্যে হয়েছে৷ ফলত, রাজনীতির সংকীর্ণতা কিংবা তুচছ দলতন্ত্র ভুলে হেমাঙ্গ বিশ্বাস বা নিবারণ পণ্ডিতের মতো মনীষীর শিক্ষাকে যদি আমরা নিঃসংশয়ে আত্মস্হ করতে পারি, তাহলে সেটা আমাদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম–উভয়ের কাছেই মঙ্গলের৷

    ঋণস্বীকারঃ দি সানডে ইন্ডিয়ান।। অরুপ দাস, নগরনাট, সিলেট।

A.B. Mahmud Hussainসৈয়দ এবি মাহমুদ হোসেন (১৯১৬-১৯৮২) জন্মস্থান- লস্করপুর, হবিগঞ্জ।

সৈয়দ এবি মাহমুদ হোসেন ১৯৭৫-১৯৭২ খ্রিঃ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। জীবদ্দশায় তিনি ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের চেয়ারম্যান, হবিগঞ্জ লোকাল বোর্ডের সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য, পাকিস্তান চা বোর্ডের সদস্য, ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ের উপদেষ্টা, পাকিস্তান শরণার্থী পূনর্বাসন কর্পোরেশনের পরিচালক, পাকিস্তান কনস্টিটিউয়েন্ট এসেম্বেলীর সদস্য, কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারী এসোসিয়েশনের সদস্য, আন্তপার্লামেন্টারী ইউনিয়নের সদস্য, আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের প্রেসিডেন্ট, সেন্টাল ল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, শেফ ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট এর পেট্রন, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে গেছেন। সৈয়দ আবুল বাসার মাহমুদ হুসেন ১৯১৬ খ্রি. হবিগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার লস্করপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি শায়েস্তাগঞ্জ হাইস্কুল, সিলেট এম সি কলেজ, কলকাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। ঢাকা দারুল উলুম আহসানিয়া মাদ্রাসার প্রধান হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে ১৯৩০ খ্রি. হবিগঞ্জ বারে যোগদানের মাধ্যমে জড়িত হয়ে পড়েন আইন পেশায়। ১৯৪৩-৪৮খ্রি. পর্যন্ত এপিপি’র দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৪৪-৪৭ খ্রি. আসাম প্রভিন্সিয়াল মুসলিম লীগের কাউন্সিলার, ১৯৪৫-৪৭ খ্রি. নিখিল ভারত মুসলিম লীগের কাউন্সিলর, ১৯৪৭-৫৫ খ্রি. নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের কাউন্সিলর ছাড়াও পাকিস্তান ও সিলেট রেফারেন্ডাম আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। কর্ম জীবনে তিনি ১৯৫১ খ্রি. ফেডারেল কোর্ট অব পাকিস্তানের এটর্নি, ১৯৫৮ খ্রি. পাকিস্তান সুপ্রীম কোর্টের সিনিয়র এডভোকেট পরে পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত এডভোকেট জেনারেল, ১৯৬৫খ্রিঃ তিনি পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে যোগদান করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের এপিলেট ডিভিশনের বিচারপতি নিযুক্ত হন। এ মহান পুরুষ ১৯৮২ খ্রি. ২ আগস্ট ইন্তেকাল করেন।

মেজর জেঃ (অবঃ) এম,এ,রব (১৯১৯-১৯৭৫) জন্মস্থান- খাগাউড়া,

বানিয়াচং, হবিগঞ্জ।

 •   মুক্তিযুদ্ধের উপ সর্বাধিনায়ক মেজর জেঃ এম,এ, রব মুক্তিযুদ্ধে অসম সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হন। ৭০ ও ৭৩ এর নির্বাচনে এম,পি নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ এ কমনওয়েলথ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। এম. এ. রব ১৯১৯ খ্রি. ১ জানুয়ারি হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার খাগাউড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, সিলেট এমসি কলেজ ও আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষে ১৯৪৩ খ্রি. ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কমিশন্ড লাভ করেন। তিনি আরাকান সীমান্তে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন। তিনি ইন্দোনেশিয়ায় ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ইউনিটে কমান্ডার হিসাবে কৃতিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেন । তিনি ভারত বিভাগের পূর্ব পর্যন্ত দিল্লী সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন। এরপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর স্টাফ মেজর, ডেপুটি এসিটেন্ট এডজুটেন্ট, লেঃ কর্ণেল, কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল পদেও ছিলেন। তিনি ১৯৭০ খ্রি. সেনাবাহিনী হতে অবসর গ্রহণ করে রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসাবে বানিয়াচং-নবীগঞ্জ-আজমিরীগঞ্জ আসন থেকে জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ খ্রি. মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে তাঁকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম চীফ অব স্টাফ ও মুক্তিযুদ্ধের সেকেন্ড ইন-কমান্ডের দায়িত্ব দেয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধে অসম সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাঁকে বীরোত্তম খেতাবে ভূষিত এবং মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করা হয়। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনেও তিনি এমপি নির্বাচিত হন । ১৯৭৫ সালে কমনওয়েলথ সম্মেলনে এম. এ. রব বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৭৫ খ্রি. ১৪ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। অকৃতদার এম. এ. রব হবিগঞ্জ শহরের উমেদনগর এলাকায় চিরশায়িত আছেন।

 

ড. আব্দুর রশিদ চৌধুরি ( ১৯১৯-১৯৮১)

জন্মস্থান- বগাডুবি, চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ।

• তিনি হবিগঞ্জের প্রথম ডাইরেক্ট ডিগ্রিপ্রাপ্ত কৃতিসন্তান ছিলেন। বুয়েট এর প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চ্যান্সেলর ড. আব্দুর রশিদ চৌধুরি  শিক্ষা জীবনে সকল ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণি অর্জন করেন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্ঠা (মন্ত্রীর মর্যাদায়) পিএসসির চেয়ারম্যান, জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ দাবা ফেশনের সভাপতিসহ অনেক জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।১৯৬৬ সালে তৎকালীন সরকার তাকে সিতারা-ই-পাকিস্তান খেতাবে ভূষিত করেন।

 

সায়ীদুল হাসান (১৯২২-১৯৭১) জন্মস্থান- কামালখানী, বানিয়াচং, হবিগঞ্জ।

 

  • শহীদ বুদ্ধিজীবী সায়িদুল হাসান বাঙ্গালীদের প্রথম ইষ্টার্ন ব্যাংকিং এর  পরিচালক ছিলেন। ১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেক জানমাল রক্ষা করেছিলেন। তিনি কর্মজীবনে সোহরাওয়ার্দীর অনুরোধে লন্ডস্থ ও শ্রীলঙ্কাস্থ হাইকমিশনে ট্রেড কমিশনার হিসেবে চাকুরী করেন।

 

প্রফেসর মোহাম্মদ আলী (১৯২৩-২০০৩) জন্মস্থান- বানিয়াচং, হবিগঞ্জ।

 

  • প্রখর স্মৃতি শক্তির  অধিকারী প্রফেসর মোহাম্মদ আলী বাংলা, ইংরেজী, গণিত, ভূগোল, ইতিহাস, অর্থনীতি, পৌরনীতি, প্রভৃতি বিষয়ে সমান পারদর্শী ছিলেন। কর্মজীবনে তিনি এমসি কলেজ, বৃন্দাবন কলেজ সহ একাধিক কলেজে অধ্যাপনা করেন। সর্বশেষ তিনি বৃন্দাবন কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে অবসর নেন।

 

দেওয়ান ফরিদ গাজী এমপি (১৯২৪-২০১১) জন্মস্থান- দেবপাড়া, হবিগঞ্জ।

 

  • ৫২ এর ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ৪ ও ৫ নং সেক্টরের এড্যাওমিনিস্ট্রেড ও এডভাইজার ছিলেন। সিলেট বিভাগ আন্দোলনের তিনি ছিলেন নেতৃত্ব স্থানীয় ব্যাক্তিত্ব। তিনি ১৯৭০,১৯৭৩,১৯৯৬,২০০১ এবং ২০০৮ সালে পরপর ৫ বার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

 

সিরাজুল হোসেন খান (১৯২৬-২০০৭) জন্মস্থান- বানিয়াচং, হবিগঞ্জ।

 

  • তিনি এরশাদ সরকারের সময় মন্ত্রিসভায় একজন সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারন সম্পাদক ছিলেন। তিনি দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার সহ বিভিন্ন সংবাদপত্রের সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি বানিয়াচং গ্রামের এক বিখ্যাত রাজনৈতিক পরিবারে ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। বিশিষ্ট সাংবাদিক জনাব সিরাজুল হোসেন খান দৈনিক পাকিস্তান অবজারভারের সহ সম্পাদক, পাকিস্তান টাইমসএর ঢাকা সংবাদদাতা ছিলেন। ১৯৫০ সালে তিনি এম এ পাশ করেন। পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সম্পৃক্ততার কারণে ১৯৬৭-১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে দুইবারে প্রায় ১৪ মাস কারাভোগ করেন। নিউজ এজেন্সী এনা, ইতার তাস, ভারতের ইউ এন আই এর সাথে কাজ করেন। তিনি ২০০৭ সালে ঢাকায় ইন্তেকাল করেন।

 

শাহ এ এস এম কিবরিয়া (১৯৩১-২০০৫)

জন্মস্থান- জালালশাপ,নবীগঞ্জ, হবিগঞ্জ।

  • স্কুল জীবনে হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করা পর্যন্ত আজীবন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়া শাহ এ এস এম কিবরিয়া পাকিস্তান সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস পরিক্ষায়ও  প্রথম স্থান লাভ করতে সক্ষম হন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের নবগঠিত পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের মহাপরিচালক ও পরে সচিব পদে পদোন্নতি লাভ করেন। এ ছাড়া তিনি জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। শাহ এ এম এস কিবরিয়া ১৯৩১খ্রি. ১ মে হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার জালালশাপ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৪৭ খ্রিঃ হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় হতে প্রথম বিভাগে মেট্রিক ও ১৯৪৯ খ্রি. সিলেট এমসি কলেজ হতে প্রথম বিভাগে আইএ পাশ করেন । আইএ পরীক্ষায় তিনি সম্মিলিত মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। পরে তিনি ১৯৫২- ১৯৫৩ খ্রি. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে অর্থনীতিতে যথাক্রমে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন । উভয় পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯৫৪ খ্রিঃ পাকিস্তান সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিসেস পরীক্ষায়ও প্রথম স্থান অধিকার করেন। তিনি পাকিস্তান সরকারের পররাষ্ট্র সার্ভিসে যোগ দিয়ে বোস্টনস্থ ফ্লেচার স্কুল অব ল এন্ড ডিপ্লোমেসি এবং লন্ডনস্থ ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৫৭ হতে ১৯৭০ খ্রি. পর্যন্ত তিনি কায়রো, কলকাতা, জাকার্তা, নিউইয়র্ক, ইসলামাবাদ, ওয়াশিংটনে কুটনীতিক এর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ খ্রি. তিনি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাংলাদেশের নবগঠিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ও পরে সচিব পদে পদোন্নতি লাভ করেন । ১৯৭৩খ্রি. তিনি অষ্ট্রেলিয়া, ফিজি ও নিউজিল্যান্ডে হাইকমিশনার নিযুক্ত হন। হবিগঞ্জের গর্ব শাহ. এ. এম. এস. কিবরিয়া সার্কের ধারণা সম্বলিত মূল দলিল প্রণয়ন করেন এবং ১৯৮১খ্রি. তিনি জাতিসংঘের উপ-মহাসচিবের পদমর্যদায় এসকাপের নির্বাহী সচিব নিযুক্ত হন। তিনি ১৯৮৭ হতে ১৯৯২খ্রি. পর্যন্ত কম্বোডিয়ায় জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেষ দূতের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯২খ্রি. দেশে ফিরে তিনি আওয়ামীলীগে যোগদান করেন এবং দলের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য নিযুক্ত হন। ১৯৯৪ সনে শেখ হাসিনার উপদেষ্টা ও ১৯৯৬ এর নির্বাচনে আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাচনী স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। পরে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় গেলে কিবরিয়াকে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়। ২০০১খ্রি. ১ অক্টোবরের নির্বাচনে তিনি হবিগঞ্জ-৩(সদর- লাখাই) আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ’৫২-র ভাষা আন্দোলন  এবং ‘৭১ এর মুক্তিযুদ্ধেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ২০০৫খ্রি. তারিখের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জ জেলার বৈদ্যের বাজারে এক জনসেবায় বক্তৃতা শেষে আততায়ীদের গ্রেনেড হামলায় মৃত্যু বরণ করেন এ ক্ষণজম্মা পুরুষ।

 

কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরি (১৯৩৩-১৯৯১)

জন্মস্থান- খাগাউড়া, বাহুবল, হবিগঞ্জ।

•  ১৯৫১, ১৯৬৬, ১৯৬৯, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ সহ বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে তিনি অগ্রনী ভুমিকা পালন করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি পদক লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি হবিগঞ্জ মহকুমার গভর্নর হন। এছাড়া বাংলাদেশ চা বোর্ড ও হবিগঞ্জ কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের দায়িত্ব পালন করেন। কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার খাগাউড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জম্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মাওলানা আব্দুল বশীর চৌধুরী ও মাতা সৈয়দা ফয়জুন্নেসা খাতুন। দেশের অন্যতম এ সাহসী পুরুষ ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং কারাবরণ করেন। ১৯৬৬’র ৬ দফা আন্দোলনেও ছিলেন সক্রিয়। সে জন্য কারাবরণকরেন দীর্ঘদিন। ১৯৬৯’র স্বৈরাচার আইয়ুব বিরোধী গণঅভূথানে হবিগঞ্জে নেতৃত্ব দেন। এ জন্যও তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। ১৯৭০-র নির্বাচনে আওয়ামীলীগ হতে বাহুবল, চুনারুঘাট ও শ্রীমংগল নিয়ে গঠিত সংসদীয় এলাকা হতে বিপুল ভোটে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। জননেতা মানিক চৌধুরীকে হবিগঞ্জ তথা দেশবাসী যে কারণে মনে রাখবে তা হলো ১৯৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সাহসী ভূমিকা। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে ২৪ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের টেলিগ্রাম পেয়েই গঠন করেন হবিগঞ্জ সংগ্রাম পরিষদ। গ্রহণ করেন বৃহত্তর সিলেটের গণমুক্তি বাহিনীর অধিনায়কত্ব। যুদ্ধ শুরু হলে তিনি হবিগঞ্জের তৎকালীন মহুকুমা প্রশাসক ড. আকবর আলী খানকে (তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা) অস্ত্র ধরেন এবং তাঁর সহযোগিতায় হবিগঞ্জ অস্ত্রাগার লুট করে সেখান থেকে ৭শ ৫০টি রাইফেল নিয়ে তা মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিলিয়ে দেন। তিনি হবিগঞ্জ মহকুমা কারাগারের তালা জোরপূর্বক খুলে দিয়ে কারাবন্দিদের ছেড়ে দেন। তিনি হবিগঞ্জ ট্রেজারী ও রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকে হামলা করে সেখান থেকে সব অর্থ লুট করে তা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাত্যহিক ব্যয় নির্বাহে ব্যয় করেন এবং বাকী টাকা দিয়ে ভারত হতে অস্ত্র ক্রয় করেন। তিনিই প্রথম ভারতের আগরতলায় ভারতীয় সরকারের সাথে অস্ত্র ক্রয় চুক্তি স্বাক্ষর করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করেন। সহ সর্বাধিনায়ক কর্ণেল এম. এ. রব, সেক্টর কমান্ডার মেজর সি. আর. দত্ত তাঁকে সিভিলিয়ন সেক্টরে প্রথম কমান্ডেন্ট উপাধীতে ভূষিত করেন। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে নির্বাচনে তিনি মাধবপুর হতে আওয়ামীলীগ প্রার্থী হিসাবে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি মাধবপুর উপজেলা জুড়ে বর্তমানে যে স্বল্প গভীর নলকুপ ব্যবহৃত হয় (গাই প্রকল্প) তার প্রচলন ঘটান। যার উপর নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুছ গবেষণা করেন। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে এজন্য কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী রাষ্ট্রপতি পদক পান। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি হবিগঞ্জ মহকুমা গভর্ণর হন। তিনি বাংলাদেশ চা বোর্ড ও হবিগঞ্জ কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক এর চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন। তিনি কৃষকলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি ও আওয়ামীলীগ হবিগঞ্জ মহকুমা কমিটিরও সভাপতি ছিলেন। শেষ জীবনে তিনি জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম উপজেলা নির্বাচনে বাহুবল উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় পার্টি হতে নবীগঞ্জ বাহুবল আসনে নির্বাচন করে পরাজিত হন। শেষ জীবনে তিনি ধর্মকর্মের উপর বেশী অনুরক্ত হয়ে পড়েন। তিনি হবিগঞ্জ জিরো পয়েন্ট আব্দুল হাফিজ আফাই মিয়ার অর্থায়নে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ দুর্জয় এর অন্যতম উদ্যোক্তা। এ মহান পুরুষ ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের ১০ জানুয়ারি হবিগঞ্জ শহরের পুরাতন হাসপাতাল রোডস্থ নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন এবং শায়েস্তানগর কবরস্থানে চির শায়িত আছেন।

 

Jonab Ali AMএ্যাডভোকেট জনাব আলী

(১৯৩৭-১৯৮৫)

জন্মস্থান- দক্ষিণ যাত্রাপাশা,

বানিয়াচং, হবিগঞ্জ।

  • তিনি জনাব আলী কলেজের প্রতিষ্ঠাতা, ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও শিক্ষানুরাগী এডভোকেট জনাব আলী ১৯৩৭ সালের ১ মে হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার দক্ষিণ যাত্রাপাশা মহল্লার বড়বাড়িস্থ এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৫৩ সালে বানিয়াচং এল. আর হাই স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক, ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে বৃন্দাবন কলেজ হবিগঞ্জ থেকে প্রথম বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ১৯৫৭ সালে একই কলেজ থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে স্নাতক, ঢাকা সেন্ট্রাল ল কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে এল. এল. বি. পাশ করেন। তিনি ১৯৮৫ সালের ১৫ মে হবিগঞ্জ শহরের নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন।

 

 

এম এ মোত্তালিব (১৯৪১-১৯৯৪) জন্মস্থান- সুলতান মাহমুদপুর, হবিগঞ্জ।

তিনি মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩ নং সেক্টরের গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। তিনি যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে ওয়ার্ক ওপেন ইউনিভার্সিটি, গোল্ডস্মিট কলেজ অব এডুকেশন সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। শ্রমিকদের নেতা গণ্য হয়ে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থায় ১৯৭৩ সালে টেক্সটাইল কমিটির পর্যবেক্ষক এবং ১৯৭৮ সালে বিশ্ব সম্মেলনের ডেলিগেট হিসেবে অংশগ্রহন করেন। এম. এ. মোত্তালিব ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে হবিগঞ্জ শহর সংলগ্ন সুলতান মাহমুদপুর গ্রামে সাধারণ গৃহস্থ পরিবারে জম্ম গ্রহণ করেন। তিনি হবিগঞ্জ হাইস্কুলে বাল্যকালে শিক্ষা লাভ করেন। সাবেক পাকিস্তান নৌ-বাহিনীতে বয়েজ ক্যাডেটে যোগদানের জন্যে তিনি মাধ্যমিক পরীক্ষার পুর্বেই হাইস্কুল ত্যাগ করেন। কিন্ত নৌ-বাহিনীতে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের বয়েজ ক্যাডেটদের কমিশন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই দেখে তিনি ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় মাধ্যমিক শিক্ষাত্তোর কারিগরী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং সাবেক পাকিস্তান কারিগরি প্রশিক্ষণ বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের মাঝে প্রথম স্থান অধিকার করার গৌরব অর্জন করেন। পরে লৌহ শিল্প ও কারিগরী সহযোগিতা কেন্দ্রে বিশেষ ট্রেনিং সমাপ্তির পর ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানায় ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে টেকনেশিয়ান হিসেবে চাকুরী গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি জয়দেবপুরস্থ বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির শ্রমিক ইউনিয়ন ও জয়দেবপুর ডিজেল প্ল্যান্ট শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন করেন। এম এ মোত্তালিব ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ৩১ মার্চ পর্যন্ত এলাকা মুক্ত রাখতে সক্ষম হন ও পরে মুক্তি বাহিনীর ২ ও ৩ নম্বর সেক্টরের আওতায় বি. আই. ডি. সি গেরিলা ইউনিট গঠন করেন এবং এর কমান্ডার হিসাবে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় নেতৃত্বদান করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে দেশ বিদেশের পত্রপত্রিকা, বেতার ও টেলিভিশনে এম. এ. মোত্তালিবের বিভিন্ন বক্তব্য বিবৃতি প্রচারিত হয়। যুক্তরাজ্য অবস্থানকালে এম. এ. মোত্তালিব ওয়ার্ক ওপেন ইউনিভারসিটি, গোল্ডস্মিট কলেজ অব এডুকেশন এবং লন্ডন স্কুল অব ওরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজে সমাজ বিজ্ঞান, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, ইংরেজী, অর্থনীতি ও ইতিহাস শাস্ত্রে  ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। তখনি তিনি যুক্তরাজ্যে রেইস রিলেশন ইনস্টিটিউট, ট্রাই কন্টিনেন্টাল লিভারেশন ইনস্টিটিউট, এশিয়ান সোশালিস্ট ফোরাম, অল রীড এগেইন্স্ট ইমপেরিয়েলিজম, পুর্বাঞ্চলীয় প্রগতিশীল চিন্তাবিদদের সমিতি ও জার্নাল অব কনটেমপরারী এশিয়া এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরস্ত্রীকরণ কনফেডারেশনের সদস্য নির্বাচিত হন। বাংলাদেশের অধিকাংশ শ্রমিকের নেতা গণ্য হয়ে জাতিসংঘের অন্যতম এজেন্সি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে টেক্সটাইল কমিটির পর্যবেক্ষক এবং ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ব সম্মেলনের ডেলিগেট হিসাবে অংশগ্রহণ করেন। ঐ সম্মেলনেই বাংলাদেশ আইএলও এর গভর্নিং বডিতে সদস্য নির্বাচিত হয়। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য ছিলেন।  জনাব এম. এ. মোত্তালিব ১৯৯৪ সালের ৩০ জুন শ্রীমঙ্গলে মৃত্যুবরণ করেন।

 

এ্যাডঃ ফকির মোঃ তালিব হোসেন ( ১৯৪৭-২০০৭)

জন্মস্থান-নিজমাগুরউন্ডা, হবিগঞ্জ।

 

  • স্বাধীনতা উত্তর জনগনের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবিগঞ্জ পৌরসভার প্রথম চেয়্যারম্যান। তিনি একেবারে তরুণ বয়সে পরপর দুই বার জনগনের প্রত্যক্ষ ভোটে হবিগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এছাড়া বিশিষ্ট আইনজীবি ও সমাজসেবী হিসেবে তিনি হবিগঞ্জ জেলায় সুপরিচিত ছিলেন।

 

জগৎ জ্যোতি দাশ (১৯৪৯-১৯৭১) জন্মস্থান- আজমীরিগঞ্জ, হবিগঞ্জ।

 

  • তিনি পাকিস্তানের শিক্ষা আন্দোলন ঊনসত্তরের গনয়ান্দোলন ১৯৭০ এর অসহযোগ আন্দোলণে পুরো সিলেট মাতিয়ে রাখেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন ভাটি এলাকার দুর্ধর্ষ গেরিলা বাহিনী দাশ পার্টির কমান্ডার জগৎ জ্যোতি দাশকে তৎকালীন সরকারের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় খেতাব প্রদানের ঘোষনা দিলেও স্বাধীনতার পর তাকে বীর বিক্রম উপাধি দেয়া হয়।

 

উম্মে-আয়েশা খাতুন চৌধুরি (২০০২) দরিয়াপুর, হবিগঞ্জ।

•   তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষ করে দেশে চলে আসেন। ১৯৭৬ সালে তিনি প্রথম মহিলা হিসেবে জনশিক্ষা উপ-পরিচালকের দায়িত্বভার গ্রহন করেন। তেমনি প্রথম মহিলা হিসেবে ১৯৭৮ সালে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হন। শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রথম মহিলা পরিচালকও তিনি। উম্মে আয়েশা খাতুন চৌধুরী হবিগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার দরিয়াপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা এমসি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুর রব চৌধুরী। তিনি কলকাতা লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে অধ্যয়ন করেন। তিনি ১৯৫১ খ্রি. ফরিদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা নিযুক্ত হয়ে উচ্চতর শিক্ষার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান। ১৯৫২ খ্রি. লসিংটরে ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় হতে এম এস ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৫৪ খ্রি. বরিশাল অঞ্চলে সহকারী স্কুল পরিদর্শক ও ১৯৫৭ খ্রি. দ্বিতীয়বার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন সার্ভিস এডুকেশন ট্রেনিং গ্রহণ করে ১৯৬০ খ্রি. ঢাকা এডুকেশন সেন্টারের বিশেষ পদে যোগদান করেন। তিনি পরপর ঢাকা, খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের স্কুল পরিদর্শক ছিলেন। ১৯৭৬ খ্রি. তিনি প্রথম মহিলা হিসেবে জনশিক্ষা উপ-পরিচালকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৭৮-৮১ খ্রি. পর্যন্ত তিনি ছিলেন রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান। উল্লেখ্য, কোন শিক্ষা বোর্ডে প্রথম মহিলা চেয়ারম্যান হলেন তিনি। শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রথম মহিলা পরিচালকও তিনিই। তিনি গার্লস গাইড এসোসিয়েশনের কমিশনার ও চেয়ারম্যান ছিলেন। মিশুক, স্নেহময়ী ও পরোপকারী মানসিকতাসম্পন্ন এই চিরকুমারী নারী ২০০২ খ্রি. ৩ জানুয়ারি ঢাকায় ইন্তেকাল করেন ।

 

মরহুম মোস্তফা আলীর জীবন কাহিনী

•   মরহুম মোস্তফা আলী ১৯২১ সালে জন্মগ্রহন করেন। তিনি ১৯৩৭ সালে হবিগঞ্জ সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক , ১৯৪২সালে কলকাতা সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বি.এ এবং ১৯৪১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন ডিগ্রী লাভ করেন।
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ১৯৫৪ সালে তিনি তৎকালীন হবিগঞ্জ মহকুমা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি ছিলেন। ১৯৫৮ সালে জনাব মোস্তফা আলী মহকুমা আওয়ামিলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে তিনি তৎকালীন জাতীয় পরিষদের(পরে গণপরিষদের) সদস্য নির্বাচিত হন।
স্বাধীনতা সংগ্রামে জনাব মোস্তফা আলী সক্রিয় অংশ গ্রহন করেন। তিনি মহকুমা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক নিযুক্ত হন এবং পরে মুজিব নগরে বাংলাদেশ সরকারের উপ-আঞ্চলিক প্রশাসক হিসেবে কাজ করেন। বাংলাদেশ রেডক্রসের হবিগঞ্জ শাখা এবং হবিগঞ্জ সমাজ কল্যাণ বিভাগের চেয়ারম্যান , স্থানীয় বার এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট এবং হবিগঞ্জ সেন্ট্রাল কো অপারেটিভ ব্যাংকের চেয়ারম্যান(১৯৭০-১৯৭২) । ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৭ ই জুলাই নবগঠিত হবিগঞ্জ জেলার গভর্নর রূপে জনাব মোস্তফা আলীর নাম ঘোষনা করেন। ১৯৭৫ সালের ২৬ শে জুলাই জনাব মোস্তফা আলীর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গভীর শোক প্রকাশ করেছিলেন। হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামিলীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য জনাব মোস্তফা আলী ছিলেন দেশের দুস্থঃ ও জনগণের একজন প্রকৃত বন্ধু। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাহার সক্রিয় ভূমিকার কথা জাতি চিরদিন স্মরণ করবে।

হবিগঞ্জ নাগরিক কমিটি এমন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক জনাব মোস্তফা আলীকে সম্মান প্রদর্শন করতে পারে নিজেকে গর্বিত মনে করছে। আজ এই সম্মাননা গ্রহন করবেন জনাব এডভোকেট মোস্তফা আলীর জ্যেষ্ঠ পুত্র বীর মুক্তিযুদ্ধা মোহাম্মদ আলী টিপু।

 

          প্রফেসর মোহাম্মদ আলীর জীবন বৃত্তান্ত

প্রফেসর মোহাম্মোদ আলীর পিতা-মুন্সী মোহাম্মদ সানাউল্লাহ (১৮৮৪-১৯৫৯) ছিলেন স্বনামখ্যাত ব্যক্তিত।মাতা-আয়েশা খাতুন।প্রফেসর মোহাম্মোদ আলির জন্ম ১ ফেব্রুয়ারী , ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে এশিয়ার বৃহত্তম গ্রাম বানিয়াচং এর যাত্রাপাশায় ।

প্রফেসর মোহাম্মোদ আলী প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন পারিবারিক ভাবে । শৈশব কালেই তাঁর মধ্যে লেখাপড়ার প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখা যায়। পিতা আরবি শিক্ষিত হলেও আধুনিক শিক্ষার প্রতি বীতশ্রদ্ধ ছিলেন না। প্রথম দিকে ছেলেকে আরবি শিক্ষায় শিক্ষিত করার চিন্তা ভাবনা করলেও পরে আধুনিক শিক্ষার প্রতি ছেলের আগ্রহ লক্ষ্য করে শেষ পর্যন্ত মত পরিবর্তন করেন। তাঁর শিক্ষা জীবনের সূচনা লগ্নে সহি-শুদ্ধ ভাবে কোরান শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। তিনি ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে বানিয়াচং ১৪৬ নং রায়ের পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাসিক তিন টাকা হারে বৃত্তি লাভ করেন।

উল্লেখ্য, তিনি ছিলেন ঐ বিদ্যালয়ের প্রথম বৃত্তি প্রাপ্ত ছাত্র। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তিনি বানিয়াচং লোকনাথ রমান বিহারী হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করে আসাম প্রদেশিক সরকারের মাসিক বিশ টাকা প্রতিযোগিতামূলক বৃত্তি লাভ করেন।এটা ছিল ঐ হাই স্কুল থেকে প্রাপ্ত প্রতিযোগিতামূলক বৃত্তি। তাঁর অসামান্য কৃতিত্বের জন্য তাকে হরিশচন্দ্র রৌপ্যপদকে ভূষিত করেন।

ম্যাট্রিক পাস করার পর তিনি হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজে ভর্তি হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রথম বিভাগে আই.এ এবং ডিস্টিংশনসহ বি.এ পাস করেন। উচ্চতর শিক্ষা লাভ করার প্রবল আকাঙ্খা থাকা সত্ত্বেও আর্থিক অসচ্ছলতার কারনে লেখাপড়ায় সাময়িক ভাবে বিরতি দিয়ে বেসরকারী ও সরকারী চাকুরীতে যোগদান করেন কিন্তু তাঁর অদম্য স্পৃহার কাছে শেষ পর্যন্ত কোনও কিছুই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারেনি। তিনি নগণ্য চাকরি আকর্ষণ ছিন্ন করে ১৯৪৮-১৯৪৯ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ ক্লাসে ভর্তি হয়ে ১৯৫০ খ্রিঃ দর্শনশাস্ত্রে প্রথম স্থান অধিকার করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক পুরস্কৃত হন। তিনি এম.এ পরীক্ষায় দুটি পেপারে যে মার্ক পেয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এর আগে কেউ সে রের্কড মার্ক পাননি।

শিক্ষা জীবন শেষ করেই তিনি নোয়াখালী চৌমোহনী কলেজে অধ্যাপনায় যোগদান করেন। পরে ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজে চলে আসেন। ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি রাজশাহী সরকারী কলেজে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। উল্লেখ্য যে, তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে তখন মাত্র চারটি সরকারী কলেজে ছিল। ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সিলেট সরকারী এম.সি কলেজে যোগদান করেন। ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে পদোন্নয়নক্রমে আবার রাজশাহী সরকারী কলেজে বদলী হন। ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দ্বিতীয় বারের মতো সিলেট সরকারী কলেজে ( বর্তমানে এম.সি কলেজ ) যোগদান করেন এবং বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক হিসেবে প্রেষণে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে হবিগঞ্জ সরজারী বৃন্দাবন কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে নিয়োগ করা হয়। হবিগঞ্জ সরজারী বৃন্দাবন কলেজের কারনে পর তিনি প্রথম প্রিন্সিপাল। ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সরকারী চাকরী থেকে অবসর গ্রহন করেন।

সরকারী চাকরী থেকে অবসর গ্রহনের পর কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার কোম্পানীগঞ্জ বদিউল আলম কলেজে এবং কুমিল্লা মহিলা কলেজের প্রিন্সিপাল হিসাবে দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ঐ কলেজের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। মৃত্যুর কয়েক বছর পূর্ব পর্যন্ত তিনি বানিয়াচং শচীন্দ্র কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। উল্লেখ্য যে, প্রফেসর মোহাম্মদ আলি উক্ত কোম্পানীগঞ্জ বদিউল আলম কলেজ ছাড়া বাকি তিনটি কলেজেরই প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল ছিলেন।

প্রফেসর মোহাম্মদ আলি ষাটের দশকে সাবেক পাকিস্তানের হায়েদ্রাবাদ এবং করাচীতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান ফিলসফিক্যাল কংগ্রেস  এ যোগদান করে দর্শন শাস্ত্রের উপর মূল্যবান প্রবন্ধ পাঠ করেন। হায়দ্রাবাদ সম্মেলনের দলনেতা ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ও প্রফেসর মোহাম্মদ সাইদুর রহমান।

হবিগঞ্জ মহিলা কলেজের প্রিন্সিপাল হিসাবে দায়িত্ব পালন কালে তিনি জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ ১৯৯০ এ চট্টগ্রাম বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ কলেজে শিক্ষক নির্বাচিত হন এবং দশ হাজার টাকার পুরস্কার সহ সম্মান লাভ করে। শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে ৬ জানুয়ারী তাঁকে ‘মহাকবি সৈয়দ সুলতান সাহিত্য ও গবেষণা পরিষদ পুরষ্কার’ পদক প্রদান করা হয় একটি বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। জাতীয় গ্রন্থ দিবস ও সপ্তাহ-৯৫, হবিগঞ্জ উপলক্ষে শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দের ৪ জানুয়ারী তাঁকে সম্মানসূচক সনদপত্র প্রদান করা হয়। প্রফেসর মোহাম্মদ আলি ২৮শে এপ্রিল ২০০৩ সাকে ইন্তেকাল করেন।

হবিগঞ্জ নাগরিক কমিটি এমন একজন সাহিত্যঅনুরাগীকে সম্মান প্রদর্শন করতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করছে। আজ এই সম্মাননা গ্রহন করবেন প্রফেসর মোহাম্মদ আলির দ্বিতীয় সন্তান হবিগঞ্জ সরকারী মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর জাহানারা খাতুন।

বিরল ব্যক্তিত্ব ডাঃ সৈয়দ গোলাম রহিম (ময়না মিয়া সাহেব)

জীবন ও কর্ম

Syed Golam Rohim moyna miyaলেখকঃ-সৈয়দ মোজাফফর ইমাম (সাজ্জাদ)

বানিয়াচং-এর সৈয়দ গোলাম রহিম আনুমানিক ১৮৮২ইং সালে পীর মৌলভি সৈয়দ গোলাম সামদানি (রহঃ) সাহেবের ঔরষে ও দেওয়ান সালেহা খাতুন চৌধুরীর গর্ভে বানিয়াচং গ্রামের ঐতিহ্যবাহী মীর মহল্লার (উত্তরগড় হাবিলী) এই সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন । তাহার পূর্ব পুরুষ কুতুবুল আউলিয়া সৈয়দ ইলিয়াছ কুদ্দুছ (রহঃ) এর চতুর্থ পুত্র সৈয়দ শাহ বদর উদ্দিন (রহঃ) এর বংশধর । তিনি চির নিদ্রায় আছেন মুড়ারবন্দ দরবার শরীফে । উনার পিতা সৈয়দ কুতুবুল আউলিয়া মাজার শরীফের ভিতরে ডানদিকে প্রথম সারিতে শায়িত আছেন । মুড়ারবন্দ দরবার শরীফের মাজারগুলির নকশাতে উল্লেখ আছে সৈয়দ বদর উদ্দিন (রহঃ) এর মাজার । ডাক্তার সৈয়দ গোলাম রহিম প্রাথমিক শিক্ষা ও হাই স্কুল শিক্ষা নিজ গ্রামেই শেষ করেন এবং সুনামের সাথে এন্ট্রাস পাশ করেন । উনার নানা স্নানঘাট নিবাসী দেওয়ান তমিজ উদ্দিন আহমদ চৌধুরীর আদেশে উনাকে কলকাতায় লেখাপড়া করিতে পাঠানো হয় । নানার আদেশে তিনি ডাক্তারি পড়া শুরু করেন এবং সুনামের সঙ্গে ডাক্তারি ডিগ্রি পরীক্ষা এল.এম.এফ. পাশ করেন । পাশ করার পরপরই তৎকালীন কলকাতায় উনাকে মেডিকেল অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় । পরবর্তীতে তাঁকে সাবেক হবিগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে জেলা) আজমিরীগঞ্জ থানার কাকাইলছেও হেলথ সেন্টারে মেডিকেল অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং সেখান থেকেই তিনি অবসর গ্রহণ করেন । অবসর গ্রহনের পর তিনি স্থানীয় বানিয়াচং বড় বাজারে একটি চিকিৎসালয় গড়ে তুলেন । কিছুদিন তিনি সেখানে মানুষের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন । পরবর্তীতে ঐ চিকিৎসালয় নিজ বাড়িতে স্থানান্তর করেন । ডাক্তার সৈয়দ গোলাম রহিম শুধুমাত্র একজন খ্যাতিমান ডাক্তারই ছিলেন না,তিনি একজন আধ্যাত্মিক কামেল,পীর ও বুজুর্গ ব্যক্তিও ছিলেন ।

তিনি হবিগঞ্জ জেলার পাশাপাশি কিশোরগঞ্জ জেলার ব্যাপক এলাকার আর্ত-পীড়িত মানুষের বিনামুল্ল্যে চিকিৎসা করতেন । তাঁর প্রতি সাধারন মানুষের এতো বেশি ভক্তি,স্রদ্ধা ও বিশ্বাস ছিল যে,তিনি মানুষের গায়ে হাত বুলালে সব ধরনের রোগ দূর হয়ে যেত বলে শুনা যায় । তাঁর পুরো জীবনই তিনি সমাজ সেবা ও আধ্যাত্মিক সাধনায় ব্যয় করেছেন । বলা বাহুল্য, ১৩৫০ বাংলা সনে বানিয়াচঙ্গে মরনঘাতী ম্যালেরিয়া রোগ মহামারী আকারে দেখা দিলে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় তিনি প্রত্যেক্ষ ও পরোক্ষভাবে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন । নিজ বাড়ির মহল্লায় জামে মসজিদে সুউচ্চ মিনার তৈরি করতে এবং মীর মহল্লা মক্তবখানা তৈরি করতে তিনি বিপুল পরিমান অর্থ দান করেন । আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশির বিয়ের অনুষ্ঠানে তিনি গোপনে অর্থ সাহায্য দান করতেন । নিজ বাড়িতে পুকুর খনন করে তিনি আত্মীয় ও প্রতিবেশিদের গোসল করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন । নিজ পাড়ায় বিশুদ্ধ পানির জন্য একটি নলকূপও বসিয়েছিলেন । এছাড়াও তাঁর আরো অনেক সামাজিক কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়া যায় ।

 

ডাক্তার সৈয়দ গোলাম রহিম প্রথম বিবাহ করেন তৎকালীন কলিকাতা নিবাসী বিখ্যাত মৌলভী সৈয়দ নওয়াব আলী সাহেবের কন্যা সৈয়দা খাইরুন নেছা-কে । মৌলভী সৈয়দ নওয়াব আলী সাহেব তৎকালীন দাউদনগর পরগণার বন্দেগীর সৈয়দ শাহ দাউদ (রহঃ)-এর বংশধর । সৈয়দা খাইরুন নেছার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন বড় ছেলে সৈয়দ জাফর ইমাম ও বড় মেয়ে সৈয়দা আনোয়ারা বেগম । ডাক্তার সৈয়দ গোলাম রহিম সাহেবের বড় ছেলে সৈয়দ জাফর ইমাম লেখাপড়া শেষ করে নিজ বাড়িতে মীরমহল্লা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন । তিনি বিয়ে করেন কিশোরগঞ্জ জেলার বিখ্যাত বৈলাই সাহেব বাড়ির উর্দু কবি মহিউদ্দিন আহমদ (মাহমুদ বাঙালী)-র একমাত্র কন্যা মোছাঃ নুরুন্নাহার সালমা খাতুন চৌধুরানীকে । মোছাঃ নুরুন্নাহার সালমা খাতুন চৌধুরানী বিখ্যাত কবি মনির উদ্দিন ইউসুফ সাহেবের চাচাতো বোন । সৈয়দ জাফর ইমাম একজন পরোপকারী,দানশীল ও ধার্মিক ব্যক্তি ছিলেন । ধনী-গরিব সকলের প্রতি তাঁর ছিল অপরিসীম ভালোবাসা । তিনি সবসময় প্রতিবেশি-আত্মীয়স্বজনের খোঁজ-খবর রাখতেন । যেকোনো বিপদে-আপদে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন । কথিত আছে যে,মহল্লার লোকেরা বলত তিনি খুব নম্র ও ভদ্র ভাবে কথা-বার্তা বলতেন । তাঁর অন্তর সুন্দর ছিল এবং তাঁর সদাচরণ ও মধুর বচন সকলেরই হৃদয় আকৃষ্ট করত । তিনি একজন ভালো ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়ও ছিলেন । মোছাঃ সালমা খাতুনের গর্ভে জন্মগ্রহন করেন একমাত্র ছেলে সৈয়দ মুজাফফর ইমাম (সাজ্জাদ) ও দুই মেয়ে সৈয়দা শামিমা আক্তার ও সৈয়দা ফাহিমা আক্তার । ডাক্তার সৈয়দ গোলাম রহিমের নাতি সৈয়দ মুজাফফর ইমাম (সাজ্জাদ) ব্যবসা ও বিভিন্ন সমাজ সেবামূলক প্রতিস্ঠানের সঙ্গে জড়িত আছেন । যেমন-আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম,বানিয়াচং সাহিত্য পরিষদ,হবিগঞ্জ তরফ সাহিত্য পরিষদ ও একটি এন.জি.ও. (ইনসার্ফ) এবং লেখালেখির পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতার কাজে নিয়োজিত আছেন । সৈয়দ মোজাফফর ইমাম বিয়ে করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাছিরনগর উপজেলার নুরপুর সৈয়দ বাড়ির মরহুম সৈয়দ আজিজুল হক (সাবেক তথ্য অফিসার,হবিগঞ্জ) সাহেবের বড় মেয়ে সৈয়দা নুজহাত তাসনুবা-কে । সৈয়দা নুজহাত তাসনুবার গর্ভে জন্মগ্রহণ করে দুই ছেলে সৈয়দ নাজমুল ইমাম ও সৈয়দ মনজুরুল ইমাম । সৈয়দ মোজাফফর ইমাম বর্তমানে বসবাস করছেন হবিগঞ্জ শহরের অনন্তপুর আবাসিক এলাকায় । সৈয়দ জাফর ইমামের বড় মেয়ের বিবাহ হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাছিরনগর উপজেলার নরহা চৌধুরী বাড়ির আজিজুর রহমান চৌধুরীর সাথে এবং ছোট মেয়ের বিবাহ হয় কুমিল্লা জেলার দক্ষিন চরর্থা নওয়াব বাড়ির সৈয়দ তারেক আহমেদের সঙ্গে,তিনি সপরিবারে অস্ট্রেলিয়া থাকেন ।

ডাক্তার সৈয়দ গোলাম রহিম সাহেবের মেয়ে সৈয়দা আনোয়ার বেগমের বিয়ে হয় আপন চাচাতো ভাই মৌলভী সৈয়দ গোলাম ছোবহানী সাহেবের সাথে । সৈয়দ ছোবহানী সাহেব একজন ব্যবসায়ী ছিলেন । তাদের পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে । ছেলেদের মধ্যে সৈয়দ গোলাম মুহিত,সৈয়দ গোলাম মুফিদ ও সৈয়দ গোলাম মাহমুদ বিভিন্ন ব্যবসা ও চাকুরীতে কর্মরত আছেন । ডাক্তার সৈয়দ গোলাম রহিম দ্বিতীয় বিয়ে করেন হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিমবাগ সৈয়দবাড়ি নিবাসী পীর সৈয়দ আব্দুল লতিফ সাহেবের কন্যা সৈয়দা সামছুন্নাহার বিবিকে । পীর সৈয়দ আব্দুল লতিফ সাহেবের পৈত্রিক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাছিরনগর উপজেলার অন্তর্গত গোকর্ণজেটা গ্রামের সাহেব বাড়িতে । সৈয়দা সামছুন্নাহারের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন ছোট ছেলে সৈয়দ গোলাম মুহিউদ্দিন ও ছোট মেয়ে সৈয়দা রাবেয়া খাতুন । সৈয়দ গোলাম মুহিউদ্দিন বহুদিন ধরে বানিয়াচং থানার বি.আর.ডি.বি. এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন । নিজ বাড়ি মীরমহল্লা প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মীরমহল্লা জামে মসজিদের মুতাওয়াল্লির দায়িত্ব পালন করে আসছেন । তিনি বিবাহ করেন চাচাতো বোন সৈয়দা সালেহা খাতুনকে । সৈয়দা সালেহার গর্ভে জন্মগ্রহণ করে আট ছেলে ও তিন মেয়ে । বড় ছেলে সৈয়দ মিজবাহ উদ্দিন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের  পৌর কমিশনার । সৈয়দ মইন উদ্দিন ব্যবসা করেন,সৈয়দ মুজাহিদ উদ্দিন গ্যাস কোম্পানিতে চাকরি করেন,সৈয়দ মোকাম্মেল উদ্দিন শাহজালাল মাজার শরিফ ওয়ার্ডের কাজি পদে দায়িত্ব পালন করে আসছেন ।

 

ডাক্তার সৈয়দ গোলাম রহিম সাহেবের তিন ভাই ও পাঁচ বোন । বড় ভাই পীর সৈয়দ গোলাম ইজদানী,দ্বিতীয় ভাই এল.আর. সরকারি হাই স্কুল,বানিয়াচং এর সাবেক হেড মৌলানা সৈয়দ গোলাম রহমান ও ডাক্তার সৈয়দ গোলাম রহিম । বড় বোনের বিয়ে হয় বানিয়াচঙ্গের কামালখানি হাসান মঞ্জিল নিবাসী মৌলভী সফিকুল হাসান সাহেবের সঙ্গে । প্রথম বোনের মৃত্যুর পর দ্বিতীয় বোনেরও উনার সঙ্গে বিয়ে হয় । তৃতীয় বোনের বিয়ে হয় লস্করপুর হাবিলি দেওয়ান সৈয়দ মাকসুদুর রেজা সাহেবের সঙ্গে,চতুর্থ বোনের বিয়ে হয় বানিয়াচং সাগরদিঘির পূর্বপাড় সৈয়দ বাড়িতে সৈয়দ আহমদ নবির সঙ্গে,পঞ্চম বোনের বিয়ে হয় চাচাতো ভাই মৌলানা সৈয়দ আবুল ফজল সাহেবের সঙ্গে । মৌলানা সৈয়দ আবুল ফজল দাওরায় হাদিস সনদ লাভ করেন । নিজ গ্রামের আলিয়া মাদ্রাসার সৈয়দ হোসাইন আহমেদ মাদানী সাহেবের উপদেশে মাদ্রাসা পরিচালনার কার্যভার গ্রহণ করেন । —————-।

ডাক্তার সৈয়দ গোলাম রহিম নিজ বাড়ি মীরমহল্লা জামে মসজিদে মাঝে মধ্যে জুমার নামাজে ইমামতি করতেন । তিনি আজীবন মসজিদের মুতাওয়াল্লি ছিলেন । অসংখ্য লোক উনার মুরিদ ছিল । তিনি শেষ বয়সে মাঝে মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়লে বাড়িতে শত শত মানুষ এসে ভীর জমাতো । তারা বাড়ির বাংলাঘর,মসজিদ ও বারান্দায় বসে উনার রোগমুক্তির জন্য আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করত । তিনি প্রায় ১১০ বৎসর পর্যন্ত জীবিত ছিলেন । ১৯৯২ইং ১০ জুলাই রোজ শুক্রবার জুমার নামাজের পর তিনি নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন) । উনাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় ।

 

জীবন ও কর্মঃ আলহাজ্ব মুন্সেফ সৈয়দ গোলাম ইমাম র.

সৈয়দ মোজাফফর ইমাম সাজ্জাদ [লেখকঃ সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক]

মওলানা সৈয়দ গোলাম ইমাম (মুন্সেফ)আনুমানিক ১৭২৫ সালে সৈয়দ গোলাম হাফিজের (মুন্সেফ) ঔরসে ও খন্দকার ফাতিমা খানমের গর্ভে বানিয়াচঙ্গের ঐতিহ্যবাহী উত্তর গড় হাবেলী বর্তমান মীরমহল্লা সৈয়দ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতামহ সৈয়দ শাহ ওয়াজিহ উদ্দীন (কাজী বিচারক) এবং মাতামহ খন্দকার হেঙ্গুউজ্জামান। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন করে উচ্চ শিক্ষার জন্য কলকাতা যান। সেখানে প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি তৎকালীন কামেল বুজের্গর সংস্পর্শে থেকে উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন। অতঃপর সকার থেকে মুন্সেফি সনদ নিয়ে লাতুর মিন্সেফ কোর্টে তার পিতার স্থলাভিসিক্ত হন। পরবর্তীকালে তিনি বানিয়াচঙ্গের মুন্সেফ কোর্টে দায়িত্ব পেয়ে বিচারকার্য পরিচালনা করেন এবং সেখান থেকে অবসর নেন।

মওলানা সৈয়দ গোলাম ইমাম সাহেবের একমাত্র ফুফু নাসিবুন নিসার বিয়ে হয়েছিল কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর জেলার বাহিরনগর ডেপুটি বাড়ী নিবাসী মৌলভী মোহাম্মদ আমজাদ (কাজী বিচারক) সাহেবের একমাত্র পুত্র মৌলভী আনিসুল হাসান সাহেবের নিকট। উল্লেখ্য তার পিতামহ মৌলভী মোহাম্মদ আরশাদুল হাস্ন ছিলেন বাদশাহ জাহাঙ্গীরের সময় (কাজী-উল-কুজ্জাত) অর্থাৎ প্রধান বিচারপতি। তার হস্তলিখিত ‘ফাতোয়ায়ে আলমগীরি’ কিতাবখানা ঢাকা যাদুঘরে সংরক্ষিত। মৌলভী আনিসুল হাসান চির লুকান্তরিত হওয়ার পর সৈয়দ নাসিবুন নিসা একমাত্র পুত্র উবেদুল হাসানকে নিয়ে বানিয়াচঙ্গ উত্তরগড় হাবেলী (সৈয়দ বাড়ী) তার পিত্রালয়ে চলে আসেন ।

উবেদুল হাসান মামার বাড়ি থেকেই লেখাপড়া করেন।পরবর্তীতে সৈয়দ গোলাম হাফেজ (মুন্সেফ) ভাগ্না মৌলভী উবেদুল হাসান ও নিজ পুত্র সৈয়দ গোলাম ইমামকে উচ্চ শিক্ষার জন্য কলকাতায় পাঠিয়ে দেন।পরবর্তীতে কলকাতা হতে উচ্চ শিক্ষা সমাপন করে, মুন্সেফি সনদ নিয়ে জুড়ির (কুলাউড়া) মুন্সেফ কোর্টে দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। তিনি সপ্তাহে এক দিনের বেতন নিতেন না। কারণ সপ্তাহে রবিবার ছিল ছুটির দিন। তাই ছুটির দিনে বেতন নেয়াটা তিনি সমুচিত মনে করতেন না। তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা ইমাম ও আজীবন ইমামতির দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। এই পরিবারে তিনিই প্রথম হজ্ব পালন করে মদীনা,মনোয়ারা,নবী করিম সা.এর রওজা শরীফ জিয়ারতের মাধ্যমে আর্জি পেশ করেন যে, তিনি তাঁরই বংশের কি না? ঐ রাত্রিতে স্বপ্নের মাধ্যমে দেখতে পান, ‘ইয়া জাদ্দি-উ’ অর্থাৎ আমার ঘনিস্ট বংশধর। উত্তরগড় হাবেলীর সৈয়দ বংশের নসবনামা তরফের সরকারী উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা বিশেষ ব্যক্তি সৈয়দ আব্দুল হালিম দ্বারা সত্যায়িত করিয়ে ছিলেন। তিনি অত্যন্ত বুজুর্গ কামেল সুফী সাধক ছিলেন।

সেখান থেকে দুজনই কৃতিত্বের সাথে উচ্চ শিক্ষা সমাপন করেন। মাওলানা সৈয়দ গোলাম ইমাম মুন্সেফি সনদ গ্রহন করে লাতুর(কুলাউড়া) মুন্সেফ কোর্টে পিতার স্থলাভিষিক্ত হন এবং মৌলভী উবেদুল হাসান তখনকার কলকাতার গভর্নর জেনারেলের মন্ত্রিসভার কাউন্সিলার মহামতি মারটিন লুথার সাহেবের গৃহ শিক্ষক নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে হায়দারাবাদের নিজ নবাব হায়দার আলীর পুত্রদ্বয়ের গৃহশিক্ষক ও নিজাম বাহাদুরের (মুন্সী) অর্থাৎ চিফ সেক্রেটারি পদে অধিস্টিত হন। কোন এক সময় তার পিতামহ বানিয়াচঙ্গে বেড়াতে আসেন এবং তাকে মামাতো বোন বিয়ে করার জন্য অসিয়ত করে যান। এর কিছু দিন পর পত্র মারফত উনার মালিকুল মউতের সংবাদ জানা যায়। উল্লেখ্য বাহেরনগর বর্তমান ডেপুটি বাড়িতে তার দৌহিত্র মৌলভি মোহাম্মদ আহমদ(ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট) এর পরবর্তী বংশধরগণ বসবাস করছেন। মৌলভি উবেদুল হাসান বানিয়াচং কামালখানি মৌলভি বাড়ির গোড়া পত্তন করেন। যা বর্তমানে ‘হাসান মঞ্জিল’নামে পরিচিত লাভ করেন। এ পরিবারে অনেক কৃতি সন্তানের জন্ম হয়। বর্তমানে ব্র্যাক-এর চেয়ারম্যান জনাব ফজলে হাসান আবেদ উল্লেখযোগ্য। তাদের পূর্ব পুরুষ প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক র. এর বংশধর বলে অভিহিত।মাওলানা গোলাম ইমামের বড় বোন সৈয়দা সাফিনা বানুর বিয়ে হয় বানিয়াচং(রাজ বাড়ি) নিবাসী দেওয়ান কুরবান রাজার পুত্র দেওয়ান আমান রাজার সাথে। অপর বোন সৈয়দা আলিমা বানুর বিয়ে হয় বানিয়াচং কামালখানী(মৌলভি বাড়ি) নিবাসী মৌলভি আনিসুল হাসান সাহেবের একমাত্র পুত্র মৌলভি উবেদুল হাসান(ফুফাতো ভাই) সাহেবের সাথে। মাওলানা সৈয়দ গোলাম ইমাম(মুন্সেফ) একজন সুপন্ডিত ছিলেন। তার হস্ত লিখিত কিতাব ও ফার্সি কবিতার মুল্যবান পাণ্ডুলিপি ছিল যা জীবদ্দশায় প্রকাশ করার সুযোগ হয় নি। পরবর্তী লিখিত পাণ্ডুলিপি ও মূল্যবান কিতাবাদি সংরক্ষনের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়।

তিনি নিজ বাড়িতে মীরমহল্লা প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীতে পারিবারিক প্রয়োজনে স্কুলটি স্থানান্তরিত করা হয়। বর্তমান সাহেব বাড়ির গোড়াপত্তন করেন মুন্সেফ সৈয়দ গোলাম ইমাম সাহেব। এই পরিবারের নক্ষত্র,মহান ব্যক্তি সৈয়দ গোলাম ইমাম ১৮৩০ সালে ইন্তেকাল করেন। তার মরদেহ হেঙ্গুমিয়ার পাড়া জামে মসজিদ ও দিঘীরপাড় পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। মৃত্যুকালে তিনি তার চার পুত্র ও এক কন্যা সন্তান রেখে যান। তার সুযোগ্য উত্তরাধিকারগণ নিজ গুনে ও জ্ঞানে সমাজে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তার বংশধরদের অনেকেই দ্বীনি শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষায় ব্রতী হয়ে পারিবারিক ঐতিহ্য বাজায় রেখেছেন।এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ডা.সৈয়দ গোলাম রহীম(ময়না মিয়া সাহেব), আদর্শ শিক্ষক সৈয়দ জাফর ইমাম,মাওলানা সৈয়দ আবুল ফজল,মাওলানা সৈয়দ আবুল খয়ের, মাওলানা সৈয়দ ফরুখ হোসেন,শিক্ষাবিদ সৈয়দ আমিরুল ইসলাম,সৈয়দ আনোয়ারুল ইসলাম,ড.সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম,সৈয়দ মিছবাহ উদ্দীন,সৈয়দ মঈনুদ্দীন,সৈয়দ গোলাম মুহিত ও মাওলানা সৈয়দ শাহীনুল ইসলাম,সৈয়দ নাজমুল ইমাম।

Syed Mojaffar Emam Sajjat  সৈয়দ মোজাফফর ইমাম সাজ্জাদ

 জেনারেল এম এ রব গবেষণা পরিষদ

 সহ সভাপতি

 তরফ সাহিত্য পরিষদ

 সাংগঠনিক সম্পাদক. হবিগঞ্জ. 01960340072

 

 

কবি দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা

দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা ১৯১৯ সালের ১৯ জুলাই হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল থানার স্নানঘাট গ্রামে জন্মগ্রহন করেন।তাঁর পিতার নাম দেওয়ান আব্দুল গনি চৌধুরী এবং মাতার নাম সালেহা খাতুন চৌধুরী।তিনি পিতা-মাতার তৃতীয় সন্তান।

শৈশবে প্রথমে নিজ বাড়িতে এবং পড়ে গ্রামের পাঠশালায় তিনি লেখাপড়া করেন।বিদ্যালয়ের পাঠদানরীতি তাঁর পছন্দ হতো না।তাই বিভিন্ন অজুহাতে প্রায়ই তিনি স্কুল কামাই করতেন। কিন্তু লেখাপড়ায় তিনি মেধাবী ছিলেন। শিক্ষক বা কারো সাহায্য ছাড়াই তিনি পাঠ্যবই পড়তেন। পাঠশালায় না যাওয়ার প্রবণতা কাটানোর জন্য তাকে মামার বাড়ি,খালাতো বোনের বাড়ি এবং শেষে অগ্রজা সহিফা খাতুনের বাড়িতে পাঠানো হয়।সেখানে তিনি কিছুদিন মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করেন।

১৯৩২ সালে দেওয়ান গোলাম মোরতাজা হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন।এখানে তিনি ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন।এখানে তার সহপাঠী ছিলেন কথাশিল্পী মিরজা আব্দুল হাই। ষষ্ঠ শ্রেণীতে বাংলা পড়াতেন দীনেশ বাবু। তিনি ঝড়ের সময় কবিতা লেখার জন্য ছাত্রদের উপদেশ দিতেন। দেওয়ান গোলাম মোরতাজা গ্রীষ্মের ছুটিতে অনেক কবিতা লিখেন এবং স্কুল খোলার পর মিরজা আব্দুল হাইকে দেখান।সে বছর বিদ্যালয় বার্ষিকীতে তার কবিতা প্রথম প্রকাশিত হয়। সপ্তম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে কবিতা প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম পুরস্কার পান।

নবম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে ছবি আঁকা ও কবিতা লেখার জন্য তার পড়ালেখা ব্যাহত হয়। বারবার স্কুল বদল করেন। ততদিনে তার পিতৃবিয়োগ হয়েছে।পড়ে তিনি কাওকে কিছু না বলে কলকাতায় চলে যান।সেখান তার পরিচিত একজনের মেসে উঠেন। পরবর্তীতে তিনি সেখানে কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তির সুযোগ পান। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন,মুকুল দে প্রমুখের স্নেহধন্য হয়ে তিনি সেখানে দুই বছর অধ্যয়ন করেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হলে তিনি বিদ্যালয় থেকে গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন এবং ব্যক্তিগত উদ্দ্যেগে তার প্রথম কবিতাগ্রন্থ অঞ্জলি প্রকাশ করেন।তিনি সাধারন মানুষের সাথে চলাফেরা বেশি করতেন। সাম্যবাদী চেতনা তার মনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এরপর তিনি আসামে চলে যান। সেখানে তিনি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সংস্পর্শে আসেন। দীর্ঘ কয়েক বছর ভারত ভ্রমন শেষে তিনি আবার দেশে ফিরে আসেন।তিনি প্রবাসে থাকাকালীন তার মা মারা যান।দেশ বিভাগের পর তিনি সুন্দাদিল গ্রামে ‘দোস্ত এ দুনিয়া’ নামে একটি সংগঠন খুলেন। এর কিছুদিন পর তিনি হবিগঞ্জে আসেন এবং স্কুল শিক্ষিকা আম্বিয়া খাতুনকে বিয়ে করেন।ষাটের দশকে তিনি কবিতা তিনি কবিটা লেখা ছাড়া ছোটগল্প লেখা  ও জাদুঘর স্থাপনে ব্রতী হন।১৯৬৮ সালে তিনি নিজ গৃহে স্থাপন করেন ‘আহরণী জাদুঘর’। ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই জাদুঘর ছাড়াও তিনি গড়ে তুলেন ধ্রুপদী চিত্রশালা এবং ‘প্রজ্ঞানী’ নামে একটি পাঠাগার।

 দেওয়ান গোলাম মোরতজার প্রকাশিত গ্রন্থরাজিঃ

কাব্যগ্রন্থঃ১/অঞ্জলি(শ্রাবণ ১৩৫০)।২/বৈরী নিসর্গে যদি আষাঢ় ১৩৮১ বাংলায় কবির ৫৭ তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে নৃপেন্দ্রলাল দাশ সম্পাদিত। ৩/তিন সত্যিতে কথা দিলাম(আশ্বিন ১৩৮৯) ৪/দুর্লভ স্বপ্নের পদাবলী

গবেষনাগ্রন্থঃ ১/লিপিতত্ত্বের নতুন আলোকে ব্রাহমী অথবা ব্রাহ্মীলিপি ও সম্রাট প্রিয়দর্শী(জুন ১৮৮৭) ২/লোকায়ত পাল-পার্বণ(নভেম্বর ১৯৮৮,কার্তিক ১৩৯৫)

স্মৃতিকথাঃ ভাসানী জীবনের অলিখিত অধ্যায় (১৯৮৮)

কাব্যগ্রন্থঃ১/ নীল নীল চেতনার ধ্রুপদী আকাশ (১৯৩৩-১৯৮২)

গবেশনাঃ১/বর্ণমালার বোধন বিকাশ ও লিপি সভ্যতার ইতিহাস(১৯৭০),

২/সিলেটের ইতিহাস(১৯৭৭,অপ্রকাশিত), ৩/দেবদেবী ধ্যান-বাহন। আত্মচরিত(অপ্রকাশিত) (রচনাকাল ১৯৭৯-৮০)। এছড়াও অগ্রন্থিত বেশকিছু গল্প,প্রবন্ধ ও কবিতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

১৯৭৯ সালে ঢাকাস্থ হবিগঞ্জ এসোসিয়েশন দেওয়ান গোলাম মোরতজাকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করে।১৯৯০ সালে বাংলাদেশ জাতীয় ঐতিহ্য পরিষদ তাকে ঐতিহ্য পুরস্কার ১৩৯৭ প্রদান করে। বাংলা একাডেমী তাঁর জীবদ্দশায় তাঁকে নিয়ে ১ ঘণ্টার একটি প্রামান্য চিত্র নির্মাণ করে।

১৮৮৯ সালের শেষ দিকে দেওয়ান গোলাম মোরতাজা অসুস্থ হয়ে পড়েন। ডাক্তার তাঁকে কর্কট রগে আক্রান্ত ঘোষণা করলে তাঁর জ্যৈষ্ঠ পুত্র নিজ কর্মস্থল জার্মানিতে তাঁকে নিয়ে যান এবং ১৯৯০ সালের ১৩ ই জুন সেখানকার স্ট্যাটিস-এর একটি ক্লিনিকে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

Habiganjinfo

হবিগঞ্জের শায়েস্তানগরে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

 

 

Share on Facebook
Free WordPress Themes - Download High-quality Templates