Thursday , 13 December 2018
এই মূহুর্তেঃ-

মেজর মোঃ ফজলুর রহমান চৌধুরী

মেজর মোঃ ফজলুর রহমান চৌধুরী

মেজর মোঃ ফজলুর রহমান চৌধুরী

মুক্তিযোদ্ধা মেজর মোঃ ফজলুর রহমান চৌধুরী

মহান মুক্তিযুদ্ধের ১১নং সেক্টরের ঢালু ক্যাম্পের ইনচার্জ বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম মেজর মোঃ ফজলুর রহমান চৌধুরী। হবিগঞ্জ জেলাধীন আজমিরীগঞ্জ উপজেলার ৪নং কাকাইলছেও ইউনিয়নের সৌলরী গ্রামে তিনি এক মুসলিম সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে ১৯৩৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর মাসে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম নান্নু চৌধুরী ও মাতার নাম মরহুমা মাহফুজা খাতুন চৌধুরানী।
ফজলুর রহমান চৌধুরী ১৯৪৮ সালে ঘরদাইড় গ্রামের মক্তব ও স্কুলে প্রাথমিক শিা সমাপন করেন। ১৯৫৪ সালে আজমিরীগঞ্জ এমাল গ্রেমাইটেড বীরচরণ হাই স্কুল বিরাট থেকে মেট্রিক এবং ১৯৫৭ সালে ঢাকা বোডের্র বৃন্দাবন কলেজ থেকে মানবিক শাখায় দ্বিতীয় বিভাগে আইএ পাশ করেন। তিনি ১৯৬০ সালে মার্চ মাসে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কুমিল্লা সেনানিবাসে রিক্রুটিং সেন্টারের মধ্যে (ই,বি,আর,সি) পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে প্রতীমান ছিলেন। একই সালে তিনি মর্দান জেলার রিসালপুর ইঞ্জিনিয়ারিং ট্রেনিং সেন্টারে যোগ দেন। সেখানে দুইবছর প্রশিণ শেষে ফায়ারিং ও খেলাধুলায় কৃতিত্বের সাথে প্রথম স্থান অধিকার করে নন কমিশন লাভ করেন। তিনি আমর্স ট্রেনিং, মাইন বিস্ফোরণ, সহ ইত্যাদি বিষয়ে দতার সাথে এবং বিশেষ ক্রীড়া নৈপুন্য প্রদর্শন করে অনেক বিজয় ট্রফি অর্জন করেন।
১৯৬৪ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে তিনি রাওয়ালী পাঞ্জাব বর্ডার লাইনে মাটিতে মাইন পুতে রাখার দায়িত্ব পান। পাক সামরিক অফিসার লেঃ কর্ণেল আনসারীর নেতৃত্বে সুবেদার ফজলুর রহমান চৌধুরী কেমকরান সেক্টরে সম্মুখ সমর যুদ্ধ করেন। ১৯৬৯ সালে জুনিয়র কমিশন অফিসার হিসেবে (জেসিও) সুবেদার পদে পদোন্নতি লাভ করেন। কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য ১৯৭০ সালে সুবেদার মেজর পদোন্নতি লাভ করেন। একই সালের ডিসেম্বর মাসে দুই মাসের ছুটি নিয়ে পাকিস্তান থেকে দেশের বাড়ি আজমিরীগঞ্জে আসেন। ছুটির অবকাশে তিনি ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় সিলেট-২ আসনের এম.এন.এ পদপ্রার্থী মেজর জেনারেল এম এ রব এর সাথে কাজ করেন। অবশ্য এম এ রবের সাথে পূর্বেই উনার সু-সম্পর্ক ছিল রব সাহেব ছুটিতে আসলে সৌলরী গ্রামে তার বাড়িতে বেড়াতে যেতেন। পরে তিনিই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের উপ-সর্বাধিনায়ক ও চীফ অব আর্মী স্টাফ। ৭০ এর সাধারণ নির্বাচনের একজন প্রত্যদর্শী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অবিসংবাধিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একাত্তরের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের অগ্নিঝরা ভাষণ শুনে ফজলুর রহমান চৌধুরী স্বাধীনতা যুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য উৎসাহিত হন। একই সালে উত্তাল মাার্চেই আজমিরীগঞ্জ ন্যাপের সভাপতি বাবু কৃপেন্দ্র কিশোর বর্মনের ঘরে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় ব্যাক্তিবর্গকে নিয়ে তখন সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হলে উক্ত সভায় উপস্থিত সামরিক অফিসার মেজর ফজলুর রহমান চৌধুরীকে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং এর দায়িত্ব প্রদান করা হয়। এবং ঐদিন ১৯৭১ সালের ১০ই মার্চ আজমিরীগঞ্জ বাজারে মুক্তিকামী জনতাকে নিয়ে ফজলুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশে রক্তিম পতাকা উত্তোলন করা হয়। দেশ মাতৃকা রার জন্য জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। মে মাসের শেষ দিকে তিনি ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। তখন অন্যান্যদের মধ্যে সফরসঙ্গী ছিলেন বৃটিশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত হাবিলদার মোঃ নুরুল ইসলাম। সমরাস্ত্রের মধ্যে ছিল ১০টি থ্রি নট থ্রি রাইফেল, একটি লাইট মেশিনগান ও মাত্র ৪০ রাউন্ড গুলি। পথিমধ্যে নানা বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে ভারতের মহেশখলা বি.এস.এফ ক্যাম্পে পৌঁছান।
সেখানে ফজলুর রহমান চৌধুরীকে ১৯শে আগষ্ট, ১৯৭১ইং একটি লাইট মেশিনগান ও ২টি সুইচ মর্টার টেস্ট করার জন্য দেয়া হয়। ২০ আগস্ট ১০ ঘটিকার সময় নেত্রকোনার কলমাকান্দা থানা আক্রমণ করার জন্য আদেশ প্রদান করা হয়। ৭২ ঘন্টা দিবা-রাত্রী সহযোদ্ধাদের নিয়ে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে কমলাকান্দা থানা শত্র“মুক্ত করেন। ২৭ আগস্ট ভারতের ১১নং সেক্টরের ঢালু ক্যাম্পের ট্রেনিং ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মেঘনা রিভার অপারেশনের জন্য সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ফজলুর রহমান চৌধুরীকে অপারেশন ইনচার্জের দায়িত্ব প্রদান করা হলে তিনি প্রয়োজনীয় সমরাস্ত্র গোলাবারুদ সহ ৫০টি নৌকা এবং তিন শতাধিক সহযোদ্ধা নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তর অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন।
১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি আজমিরীগঞ্জের উত্তর-পশ্চিম পাশ দিয়ে প্রবাহমান কালনী-কুশিয়ারা(ভেড়ামোহনা) নদী যা ভাটিতে মেঘনা নদী হিসেবে পরিচিত। পাকহানাদার বাহনীর গোলাবারুদবাহী কার্গো জাহাজ মাইন বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংস করেন। সে সময় তীব্র গুলাগুলির সন্মুখীন হন। অবশ্য ভারতীয় মিত্র বাহিনীর ফাইটার বিমান মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। গোল বর্ষণ করে। তলিয়ে দিতে সমর্থ হন হানাদারদের গানবোট। এসময় অন্যান্যদের মধ্যে সহযোদ্ধা ছিলেন নূরুল ইসলাম, তৈয়বুর রহমান খান বাচ্চু , রাজ্জাক মিয়া, শারফান আলী, মর্তুজ আলী, আক্কাছ মিয়া, আব্দুস ছোবাহান মিয়া, তারা মিয়া সিকদার প্রমুখসহ অন্যান্যরা।
২৭শে অক্টোবর কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা থানার রাজাকার ক্যাম্প দখল করা হলে, নভেম্বরের শেষদিকে অষ্টগ্রাম থানা আক্রমণের প্রস্তুতি নিলেন। ৬ ডিসেম্বর ভোরের পাখি ডাকার সাথে সাথে সুবেদার মেজর ফজলুর রহমান চৌধুরীর নির্দেশে অপারেশন চালানো হয়। পাক-হানাদার বাহিনীকে ল্য করে তার গেরিলা যোদ্ধারা অষ্টগ্রামকে মুক্ত করে নিজ জন্মস্থান আজমিরীগঞ্জ থানা আক্রমণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর ভোরে কাকাইলছেও তৎকালীন চৌধুরী বাজারে রাজাকার ক্যাম্পে বিনা বাধায় তারা প্রবেশ করেন। একই দিনে তিনি পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী নিজ বাড়ি সৌলরী গ্রামের চৌধুরী বাড়িতে এসে সহযোদ্ধাদের নিয়ে রাতের খাবার খেয়ে আজমিরীগঞ্জ থানা অপারেশনের প্রস্তুতি নেন। ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর তীব্র আক্রমনের ফলে পাক পুলিশ ও রাজকার আলবদরা পাল্টা গুলি বিনিময় হয়। প্রায় ৭ ঘন্টা গুলি বিনিময়ের পর পিচু হঠে হানাদার আলবদররা। মুক্ত হয় ভাটি বাংলার রাজধানী হিসেবে খ্যাত তৎকালীন আজমিরীগঞ্জ থানা। তখন সহযোদ্ধা ও হাজারো জনতাকে নিয়ে ও ঐতিহাসিক গরুহাটা ময়দানে বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা উত্তোলন করেন কমান্ডার ফজলুর রহমান চৌধুরী। ৭১ এর রণাঙ্গনের যুদ্ধ চলাকালীন কমান্ডার মেজর ফজলুর রহমান চৌধুরী নেতৃাত্বাধীন কমান্ডো বাহিনীর তীব্র আক্রমনে বিভিন্ন স্থানে পাক-হানাদার ক্যাম্পের পাকসেনা,পুলিশ, আলবদর ও রাজাকার বাহিনীর দুই সহস্রাধিক সদস্য তার নিকট আত্মসমর্পন করে, নিহত হয় শত শত পাকসেনা ও রাজাকার আল-বদর।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ময়দানে পাক সামরিক কর্মকর্তা ১১নং সেক্টরের অপারেশন ইনচার্জ সুবেদার মেজর কমান্ডার ফজলুর রহমান চৌধুরী তীè বুদ্ধি আর সামরিক প্রজ্ঞা দূঃসাহস দিয়ে উপস্থিত দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রতিটি অপারেশনেই সুনিশ্চিত বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। এজন্য আমরা গর্বিত। কিন্তু তার চেয়ে মুক্তিযুদ্ধে অনেক কম অবদান রেখে অনেকেই খেতাব অর্জন করলেও বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ফজলুর রহমান চৌধুরী কে খেতাব কিংবা সম্মাননা দেয়া হয়নি।
সামাজিক দায়িত্ব ঃ- জনাব ফজলুর রহমান চৌধুরী। আজমিরীগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ইউনিট কমান্ডের ৩০ বছর নির্বাচিত কমান্ডার, এ.এ.বি.সি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় বিরাট এর সভাপতি হিসেবে ২৪ বছর, ২০০৭ সালে আজমিরীগঞ্জ-বানিয়াচং ভায়া শিবপাশা সড়ক বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি, আজমিরীগঞ্জ দূর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর সহ সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে বয়োবৃদ্ধ অবস্থায় এলাকা বাসীর অনুরোধে গ্রামের সামনে নিজ উদ্ধোগে ২০১২ খ্রিঃ প্রতিষ্টিত সৌলরী এস.ই.এস.ডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ও আজমিরীগঞ্জ উপজেলার বিশিষ্ট মুরুব্বী হিসেবে আর্থ সামাজিক পঞ্চায়েত সহ বিভিন্ন কর্মকান্ডে নিবেদিত প্রাণ হিসেবে দলমত নির্বিশেষে সবার কাছে শ্রদ্ধার পাত্র বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, ফজলুর রহমান চৌধুরী।
লেখক
শেখ একে এম আজাদ, ইতিহাস সংরক, সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।

Share on Facebook
Free WordPress Themes - Download High-quality Templates